সাহিত্য

সৈয়দ মবনু’র প্রেমপত্র

প্রিয় রাধা

তোমার সাথে এভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে, তা ভাবতেও পারিনি। এখন আমার পর্যায় এমন যে, আর ভাবা-ভাবির কিছু নেই। মন শুধু চায় পূর্ণিমার চাঁদ-তারা-ফুল। জাত-কুল সব ডিঙিয়ে কালের বাসরে তুমি কি আসবে? বলো, তুমি কি আসবে কুঞ্জ সাজানো কালিক কৃষ্ণের এই বিন্দাবনে? রাধা ঐ যে তুমি সেদিন নীরবে হাসে গেলে, এই নীরব হাসির গূঢ় রহস্য তোমার নিজের কি জানা? হয়তো রাধা তা ছিল আত্মভুলা কৃষ্ণের মনোজগতে ঝড়Ñতুফান সৃষ্টির ইচ্ছেকৃত তোমার দাবা খেলা। খেলে যাও সখি, খেলে যাও, তোমার ইচ্ছে মত খেলে যাও। যাও তুমি দূরে, এতো দূরে, যতদূরে গেলে আমার বাসরে চাঁদের আলো হয় অন্ধকার। পন্ডিতরা বলেন, প্রেমের ক্ষেত্রে প্রাপ্তিতে তৃপ্তি নেই, ব্যর্থতায় নেই দুঃখ। কিন্তু তুমি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারো, এ কথা সত্য? অবশ্য তোমাকে স্বীকার করতে হবে- প্রেমের জন্ম আছে, মৃত্যু নেই।

প্রেম সর্বদা একমুখি। দেহের দূরত্ব আর বিচ্ছেদ এক কথা নয়। মন দেয়া যায়, ফিরানো যায় না। আর আমরাতো কৃষ্ণ, লোকে বলে কবি! কবিদের প্রেম যদি রূপান্তরিত হয় কাব্যে, তবে তা কাল থেকে মহাকালে বেহুলার ভেলায় নাচতে থাকে। আমার গান, আমার কবিতা যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন কারো শক্তি নেই তোমার থেকে আমাকে জুদা করার। তুমি হয়তো ভুলে যেতে পারো, কিংবা ভুলে যাওয়ার অভিনয় করতে পারো। আমি জানি তোমরা নারী-জাত শাসনের মুখোমুখি, কিংবা স্বার্থিক কারণে প্রেম ভুলে যাওয়ার অভিনয় খুব করতে পার। তবে অভিনয় কি বাস্তবতা? না রাধা, না, দৈহিকভাবে অভিনয় হলেও প্রেমের ক্ষরণ থাকে আমৃত্যু। বুকে হাত দিয়ে বলোÑ পারবে কি কোনদিন আমাকে ভুলতে?


আমি বুঝি সখি, অবস্থা আমি বুঝি; দুর্বলতা বশত কখনো কখনো নারীরা বাধ্য হয় অভিনয়ে। তুমি তোমাকে খুব দৃঢ় বলতে, শক্তিশালী ভাবতে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তো ভিন্ন। আমি বলতাম তোমাকে প্রায়-ই, নারীদের প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কথা। তুমি মানতে না, তুমি বলতে সবই মানসিক ব্যাপার। কিন্তু প্রতি মাসে যখন তোমার প্রকৃতিক অসুখ হতো তখন তুমি যে কত দুর্বল হতে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়! তখন যদি আমি বলতাম, নারীরা প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল, তবে কিছু বলতে না, শুধু হাসতে। তোমার অসহায়ত্বের সেই হাসি আজ বিচ্ছেদকালে চোখে বার বার ঝলক দিচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে নারীদের এই মাসিক অসুখের জন্য। তবে করার কিছু নেই, সবই উপরওয়ালার ইচ্ছে।

যাক, অপ্রসঙ্গিক কিছুকথা এসে গেলো। তুমি আমাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছো! এটা তো তোমার ইচ্ছেকৃত ভুলে থাকার চেষ্টা। কিন্তু তুমি কি ভুলতে পেরেছো? ভুলে থাকার চেষ্টা করার নাম প্রেমের ব্যর্থতা নয়। রাধা, বরং তা-ই প্রকৃত প্রেম। যে-জন প্রেম ভুলতে অভিনয় করে, তুমি বলো সে কি পারে কোনদিন ভুলতে? পারে না বলেইতো করে এতো অভিনয়। তুমি আমাকে যে কবিতা দিয়েছিলে তা আজও মাঝেমধ্যে পড়ি। আমি এই কবিতার প্রতিটি স্তবকের মর্মকথা হাড়ে হাড়ে অনুভব করি। প্রথম দেখায় তুমি বলেছিলে তোমার ক্ষুদ্র জীবন নিয়ে। আমি তখন বলেছিলাম-


জীবন ক্ষুদ্র নয় গঠিত হলে
মন ক্ষুদ্র নয় সমুদ্র দেখতে পেলে
এসো, হাতে হাত রেখে দু’জনে
আকাশ এবং সমুদ্র দেখি।

তুমি তখন মাসিক অসুখে ছিলে এবং পেটের ব্যথায় বারবার বলছিলে, যাও এখান থেকে, আমায় দিয়ে কিছু হবে না। নারীরা দুর্বল প্রকৃতির কাছে। নারীরা দুর্বল তোমাদের পুরুষদের কাছে। তখন আমি বলেছিলাম, জীবনের রহস্য উম্মুচন করতে পারলে সকল দুর্বলতা কেটে যায়। তখন তুমি ব্যঙ্গ হাসিতে বলেছিলে, নারীদের দিয়ে তাও হবে না। সে শুধু হবে রাঁধুনি আর বাচ্চা উৎপাদনকারিনি। তোমার একথার প্রতিবাদে আমি বলেছিলাম, হবেÑহবে, পৃথিবীতে অনেক নারী অসাধারণ অনেক কিছু করেছেন। তবে লম্প-জম্প দিয়ে কিছু হবে না, জীবনের গূঢ় রহস্য উম্মুচন করে সাধনা করতে হবে। তুমি জিজ্ঞাস করেছিলে-আমি কি সেই সাধনায় তোমার পাশে থাকবো। আমি বলেছিলামÑঅবশ্যই। অতঃপর তোমাকে জীবনের গূঢ় রহস্য উম্মোচন করে দেখাবো বলে প্রতিদিন গিয়েছি তোমার কাছে। হেটেছি তোমার সাথে অনেক পথ তোমার চলার পথে।

রাধা, তোমাকে বুঝি বলেইতো আজও নিজ হাতে মুছে দিতে চাই তোমার চোখের জল, আর সাথে দিয়ে যেতে চাই হৃদয় উজার করা ভালবাসা। মরিচীকা হবে কেনো তুমি? তুমি আমার মাটির ফুল, আমার হৃদয়ের পদ্মÑগোলাপ। ফুলের কখনো কারো কাছে যেতে হয় না। ফুলের স্পর্শে কেউ কোনদিন মরুভূমি হয় না। বিশ্বাস না হলে তুমি আমাকে দেখ। তোমার স্পর্শেÑতোমার ভালবাসায় এই হৃদয়ের মরুভূমিতে আজ থৈ থৈ সমুদ্রের জল খেলা করে। দুঃখ নিয়ে-ইতো মানুষ সামনে এগিয়ে যায়। আমাদের দুখু মিয়ার দুঃখের গল্প কি তুমি পড়নি? তাঁর দুঃখ তাঁকে পিছনে নেয়নি। আমি তোমাকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলছি। কবি মাত্র-ই আনন্দ বিলাসী। তুমি কবি-তুমি শিল্পী।

মানুষের মনে আনন্দ দেয়া তোমার কাজ। আলোর নীচে যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি যারা আনন্দ বিতরণ করে তাদের ভেতরে থাকে নিজস্ব কিছু দুঃখ। এটা প্রকৃতির নিয়ম। বিশ্বাস না হলে আমাকে দেখতে পারো। আমি যে তোমার মাঝে, তোমার মনে আনন্দ বিলাতে দৌঁড়ে আসি সময়েÑঅসময়ে, মুছে দিতে চেষ্টা করি তোমার হৃদয়-ভাঙা চোখের জল, তুমি কি কখনো জানতে চেয়েছো আমার হৃদয়ের কথা? কখনো কি চোখ উঠিয়ে দেখেছো আমার চোখের জল? এই রাধা, সম্পদের পাহাড়ের নামতো সুখ নয়। বস্তুবাদ মানুষকে বিলাসী করেছে সত্য, কিন্তু মানুষের আত্মায় সুখ দিতে পারেনি। তুমি একদিন বলেছিলে, বস্তুবাদীরা তোমাকে অন্যচোখে দেখে। হয়তো তাদের আবেগে প্রচ- বস্তুবাদ কাজ করে বলে তারা এমনটি করে থাকে। আর বস্তুবাদী অগ্রজরা যতটুকু সফলতায় নিজে যাওয়া সম্ভব হয়নি তোমাকে তা থেকেও সামনে নিয়ে যেতে চান, এই ছিলো তোমার একটা অভিযোগ। আমি জানি, তোমার বস্তুবাদী অগ্রজরা যদি তোমাকে এতটুকু না নিয়ে যেতে পারেন তবে তা তারা ব্যর্থতা ভেবে খুব কষ্ট অনুভব করবেন।

তবে তুমি বিশ্বাস রেখ, প্রতিভা স্ববিকশিত। তোমার যে প্রতিভা আছে তা হালের বলদ তৈরীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না রাখলেও একদিন সাধনার বিনিময় বিকশিত হবে। মূলত এখানেই বস্তুবাদের সাথে আত্মিক মানুষের সংঘাত। বস্তুবাদ মূলত প্রাণহীন একটা টেবিলের নাম, কিংবা কম্পিউটার। সে প্রতিষ্ঠান কিংবা পদ্ধতি অতিক্রম করতে নারাজ কিংবা সাহস পায় না। একটা পদ্ধতির ভেতরে চলতে চলতে তার চিন্তাÑচেতনা পদ্ধতির চক্রে আবদ্ধ হয়ে আজ প্রায় হালের-বলদ কিংবা চিড়িয়াখানার পশুর মতোই। এই চক্রের দেয়াল ডিঙাতে অনেকের মন চাইলেও পারে না। যেহেতু দেয়ালের অপর পাশের খবর তার জানা নেই, তাই সে ডিঙাতে গেলেই ভয় পায়।

তবে কেউ কেউ সাহস করে ডিঙায়। বিশেষ করে আত্মিক মানুষেরা এই সব দেয়াল ডিঙাতে আনন্দ পায়। এক্ষেত্রে সবার উর্ধ্বে কবিÑসাহিত্যিকÑশিল্পীরা থাকে। তুমি-আমি তাই। বিশ্বাস করো, ভালবাসার ডিঙি নৌকায় বসে আমরাও একদিন ডিঙাবো এই দেয়াল। স্বপ্নের ঘরে দুঃখেÑকষ্টে আমিও গুঁমড়ে মরি তোমার মতো। তবে বিশ্বাস আছে মনেÑপ্লাসে মায়নাসে মায়নাস হলেও মায়নাসে মায়নাসে মায়নাস নয়। তুমি কোথায় হারিয়ে যাবে, আর ভাবলে কেমনে আটকাতে পারবে না কেউ? পিছন ফিরে দেখ তোমার পিছনে আরেকজন আছে। সামনে তোমার দাঁড়িয়ে আছে তার দেহস্পর্শী চন্দ্র-সূর্য আর এক সাগর প্রেম। তুমি কি জানো সে কে? প্রেমের মৌলিক চরিত্র হলো দুঃখÑকষ্টে গুঁমড়ে মরা। তুমি কি স্বেচ্ছায় যাবে সেই পথে? রাজি হলে দেরি কিসে? হাতে হাত রেখে চলো দুজনে দুজনার হয়ে মিশে যাই প্রেমÑভালবাসার শিল্পÑনন্দনে। হারিয়ে যাই আত্মায় আত্মা রেখে দূর অজান্তে তোমার স্বপ্নের ভালবাসার নীলিমায়। আমাদের যারা মুরুব্বী, তারা অনেকটা পাঁকা বাঁশের মতো। পাঁকা বাঁশকে সুজা করতে গেলে ভেঙে যায়। পুরাতন কাউকে ভাঙতে নেই। তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দাও। আমরা তাদের থেকে উন্নত কিছু পেলে পাশ কেটে তা করে নিতে পারি। সাবধান, সফলতা না আসা পর্যন্ত তা গোপনে রাখতে হবে। নতুবা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির সম্ভবনা আছে।

অনেক মাÑবাবা শাসনের সময় একেবারে ভুলে যান তাদের শৈশব কিংবা কৈশোরে এই শাসন কতটুকু পাশ্বপতিক্রিয়া তৈরী করেছিল। তারা অনেকেই জানেন না শিশু-কিশোরের চিন্তা-চেতনার গতি-প্রকৃতি। তাই তারা এমন শাসন করেন যা উপকার থেকে অপকার বেশি হয়ে যায়। তবে আমার বিশ্বাস, কোন মাÑবাবাই হিংসা থেকে সন্তানকে শাসন করেন না, যদিও শাসনের মাত্রায় কারো কারো কিছুটা অতিরিক্ত দৃষ্টিপাত থাকে। যা তোমার এবং আমার পরিবারে আছে।

আমি এগুলো ভাঙতে চাই না। আমি বলবো কি, তুমিও তা না ভেঙে এড়িয়ে যাও, যদি মনে করো তোমার কাজ তোমাকে মঙ্গলের পথে নিয়ে যাবে। মাÑবাবাকে ক্ষুব্ধ করবে না কখনো। তাদের ওপর রেগে গিয়ে নিজের ক্ষতি করতে যাবে না। তোমাকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। ঘরে-বাইরে যত প্রতিকূলতা আছে, সব এড়িয়ে যেতে হবে যোগ্যতা আর মেধা দিয়ে। তোমার ভাঙতে ভয় কিসে? সামনে সূর্য, পিছনে আমি, উপরে ঈশ্বর, নীচে মাটি। চলো এগিয়ে। চলো দেয়াল ডিঙিয়ে। আমি এক কবি বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি, আমার প্রেম একদিন তোমাকে সকল দেয়াল ডিঙিয়ে নিয়ে যাবে দূর আলোর মঞ্জিলে। শপথ করো, আজ থেকে কখনো তুমি হবে না আমার ভালবাসাহীন নিঃসঙ্গ। হারাবে না কোনদিন আমার ভালবাসা ডিঙিয়ে অজানা-অমঙ্গলের পথে।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close