রম্য কথা

ভাই সমাচার

শরীফ মজুমদার

আমি ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বললাম,
– আমার কেমন জানি লাগতেছে।
ইমতিয়াজ চোখ পাকিয়ে বলল,
– নতুন ক্যাম্পাসে এসেই যদি কেমন কেমন লাগে তাহলে শ্বশুর বাড়িতে গেলে কী হবে?
ইমতিয়াজের খোঁচায় বেশ লজ্জা পেলাম। শ্বশুর বাড়িতে গেলে কেমন লাগবে ভাবতে যাব এমন সময়ই শুনতে পেলাম,
– অই। ওইইই।

‘অই’ এর উৎস অনুসন্ধানে ইতিউতি তাকিয়ে দেখলাম, খানিকটা দূরে একটা গাছের নিচে সিমেন্টের বেঞ্চি ঘিরে জিন্স-টিশার্ট পরা চার-পাঁচজন দাঁড়িয়ে বসে আছে। পত্র-পত্রিকা মারফত ক্যাম্পাসের ‘বড় ভাইদের’ ব্যাপারে একটু আধটু এলেম হাসিল করেছি। এনারা হয়ত সেই মহান ‘বড় ভাই’। একজন এবার হাত ইশারা করে কাছে যেতে বলল। আমি ইমতিয়াজের দিকে যথেষ্ট করূন চোখে তাকিয়ে ঢোঁক গিললাম। ইমতিয়াজ আমার ঢোঁকের মর্মার্থ উদ্ধার করে আমার আগেই হাঁটা দিয়ে বলল,
– আয়।
– ভর্তি হইতে আসছিস?”
বলেই নেতা গোছের বড়ভাই একটু ঝুঁকে আমার হাতে থাকা ফাইলের দিকে হাত বাড়াল।
ইমতিয়াজ বলল,
– জী ভাই।
তারপর যেন ফৌজদারী মামলার আসামী এমনভাবে আমাকে দেখিয়ে বলল,
– আমার ফ্রেন্ড ভর্তি হবে।
– কোন ডিপার্টমেন্ট?
– জী ভাই, বিবিএ।
সবগুলো মুখ হঠাৎ আমার দিকে ঘুরে গেল। একজন মুখটা বেশ দুঃখী দুঃখী করে বেশ আফসোসের সুরে বলল,
– আহহা।
ফাইল হাতে নেওয়া ‘বড়ভাই’ ততক্ষণে কাগজ পত্রের উপর একঝলক চোখ বুলিয়ে ফেলেছে। আমাকে ফাইলটা ফেরত দিতে দিতে বলল,
– ভালোই তো পজিশন তোর। আসার আগে খোঁজ খবর কিছু নেস নাই?
– না ভাই।
নেতা ভাই সিগারেটে একটা বড়সড় টান দিয়ে মুখ গোল করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন,
– অ।
তারপর আরেক টান এবং আরেক দফা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অন্যদিকে তাকিয়ে খানিকটা উদাস হয়ে বললেন,
– বাড়িত যা গা।
আমি আবারও আমার ঢোঁক কর্ম সম্পাদন করে ইমতিয়াজের দিকে তাকালাম। ইমতিয়াজ ঢোঁকটা অনুবাদ্ করে নিয়ে নেতা ভাইয়ের উদ্দেশে বলল,
– বুঝলাম না ভাই।
নেতা ভাই আগুণে সিগারেটে একটান দিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
– এতদিন কই চেগায়া বইসা ছিলি? সিট যে ফিল আপ হয়া গেছে জানস না কিছু? অহন বাইত যাইয়া ফিডার খা গা যা।
আমার ঢোঁক গেলার আগেই ইমতিয়াজ বলল,
– কিন্তু ভাই এখনো তো ভর্তির লাস্ট ডেইটের দশ দিন বাকি। এত তাড়াতাড়ি ফিল আপ হয় ক্যামনে?
দাঁড়ানোদের মধ্য থেকে হ্যাংলা পাতলা একজন নেতা ভাইর দিকে বিনীত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল,
– ভাই, দুইটা দেই?
বড়ভাই আসমানের দিকে এক পশলা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,
– ঝামেলা না কইরা বুঝাইয়া ক।
হ্যাংলা ভাই ‘জি ভাই’ বলে ইমতিয়াজকে বললেন,
– ভর্তি শুরু হইছে কবে?”
আমি বললাম,
– চারদিন আগে, ভাই।
– আর তোরা চাইরদিন পরে আইছস ‘সিট ফিল আপ হইছে ক্যান?’ মারাইতে!”
হ্যাংলা ভাই’র ভাষাশৈলিতে আমি আর ইমতিয়াজ টাশকি টাইপের কিছু একটা খেলাম। এটা দেখে গলায় খানিকটা দরদ ঢেলে বললেন,
– আরে বলদ, দেশের অবস্থা জানস না কিছু? চোর বাটপারে সব ভইরা গেছে। সব চলে মালের উপর। মাল খাইয়াই তো অর্ধেক সিট ফিল আপ কইরা ফেলসে হালারা।
বলেই অদূরে একটা বিল্ডিং এর দিকে চাইলেন।
পাশ থেকে খুবই কিউট চেহারার আরেক ভাই বেশ রসিয়ে রসিয়ে বললেন ,
– কাইলকা একজন আইসা সিট না পাইয়া কি কান্দাকাটি আর চিল্লাচিল্লি করসিল অফিসে। কয় “আমার সিট আরেকজনরে দিব ক্যান?”
সবার মধ্যে একটা চাপা হাসির রোল উঠল। হ্যাংলা ভাই তার ভেটকি কর্ম সম্পাদন করে বললেন,
– বুজছস তো ঘটনা কী? অহন ভর্তি অফিসে গিয়া কাইন্দাও লাভ নাই। ঝামেলা না কইরা বাইত যা গা। অন্য কোথাও গিয়া ট্রাই কর।”
আমার বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল। বুঝলাম চোখ ছলছল করছে। এখানে ভর্তি হতে না পারলে এক বছর বসে থাকা লাগবে। কত আশা নিয়ে আসছি!
ইমতিয়াজকে বললাম,
– চল।
খানিকটা এগোতেই পেছন থেকে কিউট ভাই ডাক দিলেন,
– ওই, ভাই ডাকে তগোরে।
কাছে যেতেই নেতা ভাই বললেন,

– পলিটিক্স মলিটিক্স কিছু করস?
ইমতিয়াজ আর আমি দুজনই সমছন্দে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ালাম। নেতা ভাই হ্যাংলা ভাইকে বললেন,
– অই, লিটন ভাইরে ফোন দিয়া দেখ কোনমতে একটা সিটমিট দেওন যায়নি।
হ্যাংলা ভাই খানিকটা দূরে গিয়ে হাতটাত নেড়ে, বারকয়েক ‘আরে মিয়া’, ‘হুর মিয়া’ বলেটলে এসে বললেন, “ভাই, ম্যানেজমেন্টে একটা আছে বোধহয়। কিন্তু, সাতের নিচে দিব না হালারা।

নেতাভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– কত আনছস?
ভর্তি ফি বাবদ আমি আটত্রিশশো টাকা এনেছি। সাথে আরো সাতশ এক্সট্রা ছিল। বললাম,
– সাড়ে চার হাজার, ভাই।
হ্যাংলা ভাই ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়িয়ে নেতা ভাই’র উদ্দেশে বললেন,
– হইব না ভাই। অই সিট সাতের নিচে দিবই না।”
ইমতিয়াজ আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
– তোরটা বাইর কর।
তারপর ওর মানিব্যাগ বের করে বাকি পঁচিশশো মিলিয়ে নেতা ভাইর দিকে বাড়িয়ে দিল। নেতা ভাই আমার ফাইলের জন্য হাত বাড়িয়ে হ্যাংলা ভাইকে বললেন,
– যা ভর্তি কইরা দিয়া আয়।
আর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– কী হাঙ্গামা হইল দেখলি তো। তগোরে সরল-সিধা মনে হইল তাই এত কষ্ট করলাম। ক্যাম্পাসে আইসা ভাইগো লগে থাকবি। ঘুরবি ফিরবি। অন্য কোনদিকে গেলে স্ট্রেইট ঠ্যাংঠুং ভাইঙ্গা দিমু, মনে রাখিস।
তারপর ক্যাম্পাসের তাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন ‘রুলস এন্ড রেগুলেশন্স’ নিয়ে আরও অনেক হিতোপদেশ দিলেন। আমি ‘সহমত ভাই’ ভঙ্গিতে উপরে-নিচে বার কয়েক মাথা ঝাঁকালাম।

ইতোমধ্যে হ্যাংলা ভাই একটা রিসিপ্ট নিয়ে এসে নেতা ভাই’র হাতে দিলেন। নেতা ভাই রিসিপ্টটা আমার হাতে দিতে দিতে কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে বললেন,
– তোর লাক ভাল। নইলে সিটের স ও দেখতি না।
আমি নেতা ভাই’র দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
– থ্যাংক্স ভাইয়া।
হঠাৎ নেতাভাই পকেট থেকে একশ পাঁচশ টাকার নোট বের করে আমার পকেটে গুঁজে দিতে দিতে বললেন,
– এইটা রাখ। তগো দুইজনে মিইল্ল্যা কিছু খাইস। বাসা থেইকা এতগুলা টাকা আইনা ভর্তি হইলি, তগোও তো কিছু হক আছে।
কিছু বোঝার আগেই আমার দ্বিতীয় দফা চোখে পানি চলে আসল। এমন দয়ালু ‘বড় ভাই’ কেবল এই দেশেই সম্ভব!

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close