রম্য কথা

আমি যেভাবে বিসিএস দিলাম

শরীফ মজুমদার

ইনভিজিলেটর স্যার ওএমআরে রেজিস্ট্রশন নম্বর টম্বর পূরণ করার নির্দেশনা দিতে গিয়ে বললেন, “খুবই সতর্কতার সাথে পূরণ করবেন। একটু ভুল হলেই কিন্তু জীবন বৃথা।” আমিও সর্বাত্মক সাবধানতার সাথে পূরণ করতে লাগলাম। বিসিএস বলে কথা। এত সহজে জীবন বৃথা হতে দেওয়া যায় না! কাভি নেহি।

আমার সিট পড়েছে খিলগাঁও মডেল কলেজে। রুম নম্বর দুইশ তিন। আশপাশে বেশ খোলামেলা। আলো বাতাস আছে। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। দরজার ওপাশে মাঠের মেহগনি গাছ দেখা যায়। অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ। কিছু না পারলেও এসব প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করে দুই ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। প্রশ্ন দেওয়ার সাথে সাথেই আমি ‘হারানোর কিছু নেই’ ভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কী আছে জীবনে!

গণিত দিয়ে শুরু করলাম যুদ্ধ।হিসাব নিকাশ যা আগেই চুকিয়ে নেওয়া ভাল। তারপর বিজ্ঞানের গোল্লা ভরাট করলাম। এরপর পর্যায়ক্রমে আন্তর্জাতিক, ইংরেজি, বাংলাদেশ বিষয়াবলী। পরীক্ষা শেষ হওয়ার দশ মিনিট আগে দেখলাম ভালোই দাগিয়েছি। একশ চল্লিশটার মত। আনন্দে হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্ত টবগ মেরে উঠল! নির্ঘাত পাশ। ক্ষণকালের জন্য সাদিয়ার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনে মনে একটা কবিতাও বানিয়ে ফেললাম।

“হইব আমি ক্যাডার।

ঠ্যাকাইবো কে, সাধ্যটা কোন ব্যাডার?”

বাসায় এসে প্রশ্ন মিলাচ্ছি। ম্যাথের ২০ টার মধ্যে ২ টা দাগাইনি। আর দুইটা ভুল হয়েছে। এর মধ্যে এক্স এর অনেক পাওয়ারঅলা সমাধান একটা ছিল। এত পাওয়ার দেখে আর সাহসে কুলোয় নি! অন্যটা একটা লোকের হাঁটাহাঁটি নিয়ে। লোকটা প্রথমে ৪ মাইল উত্তরে গেল। সেখান থেকে ১২ মাইল পুর্বে গেল। তারপর আবার গেল ১২ মাইল উত্তরে। তাইলে যাত্রার স্থান থেকে তার দূরত্ব কত? মাপজোখ করে লোকটা কত দূরে আছে খুঁজতে গিয়ে বেশ হয়রান হয়ে গেলাম। শেষে যেখানে পেয়েছি এখন দেখছি লোকটা নাকি সেখানে ছিল না! কী আজব! এত কষ্টের ফল এই!

বিজ্ঞানও দেখা যাচ্ছে ভালোই হয়েছে। একটা দাগাইনি। দুইটা ভুল। ডিমে কোন ভিটামিন নেই? অপশনে এ,বি,সি,ডি ছিল। মাথার মধ্যে একটা ডিম নিয়ে এসে ভিটামিনগুলা খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। খোলস, কুসুম, সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে এ আর বি ঠিকঠাক পাইলেও সি,ডি নিয়া বিশাল প্যাঁচ লাগল। শেষে ছাড়ান দিছি। আরেকটা – কোনটির জন্য পুষ্প রঙিন ও সুন্দর হয়? ক্রোমোপ্লাস্ট হবে। আমি ক্রোমাটোপ্লাস্টরে দায়ী করে আসছি!

এরপরই চোখে শর্ষে ফুল দেখা শুরু করলাম। সাধারণ জ্ঞান, ইংরেজি, বাংলায় একটার পর একটা ভুল বের হতে লাগল। ফ্ল্যাশব্যাকে আবার পরীক্ষার হলে চলে গেলাম…

ম্যাথ আর বিজ্ঞান দাগানোর পর খানিকটা ব্রেক নেওয়ার জন্য বাইরে তাকিয়েছিলাম। একটু আগের ঝুম বৃষ্টিতে মেহগনি গাছগুলো কাকভেজা হয়ে আছে। পাতা থেকে বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে পড়ছে। আহা! অপার্থিব দৃশ্য! যথেষ্ঠ রোমান্টিসিজম নিয়ে আন্তর্জাতিকে ইস্যুতে ব্যাক করছিলাম। অতঃপর…… ন্যামকে একপাশে রেখে ন্যাটোরে সদরদপ্তরহীন করলাম। জিবুতি থেকে চীনের সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিলাম জাম্বিয়ায়। উত্তর, দক্ষিণ কোরিয়ার সানশাইন পলিসি দিয়া দিলাম চীন আর রাশিয়াকে। এবং কটোউইসের পরিবর্তে লাস্ট জলবায়ু সম্মেলন করার কৃতিত্ব দিলাম প্যারিসকে ! হাম্বানটোটার বদলে চীনের নিকট শ্রীলঙ্কার গল বন্দরকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়েছি কোনরূপ ভাবনা ছাড়াই! পোল্যান্ড আর অস্ট্রিয়ার মধ্যে কোনটারে বাল্টিক অঞ্চলে পাঠানো যায় এ-নিয়ে মনে মনে বেশ খানিকক্ষণ ধবস্তাধবস্তি করার পরও সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। বেশ ক’বার মনে হয়েছিল, দেই অস্ট্রিয়ার গোল্লা ভরাট করে। ভাগ্য ভাল, অল্পের জন্য অস্ট্রিয়ারে বাল্টিকে পাঠাই নাই।

ইংরেজিতে ‘স্ত্রী মারা যাওয়া লোকটারে’ নির্দ্বিধায় ব্যাচেলর বানিয়ে আসছি! জেমস জয়েসের উপন্যাস দিয়ে দিয়েছি জোসেফ কনরাডকে! জয়েস সাহেব বেঁচে থাকলে নির্ঘাত পাইরেসির মামলা ঠুকে দিতেন। এমনকি স্বয়ং শেকসপিয়র মহোদয়কেও ছাড় দেই নি। বেচারাকে জন্মগ্রহণ করিয়েছি তাঁর মৃত্যুর ঠিক পঞ্চাশ বছর পর! বাকী বিষয় গুলার কথা আর কী-ই বা বলব!

গতকাল পেপারে একটা আর্টিকেল দেখছিলাম, “বিসিএসই জীবনের সবকিছু নয়।” পেপারটা যে কই রাখলাম……।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close