বই বার্তা

হোয়েন ব্রেদ বিকামস এয়ার–জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের এক কাব্যিক পথচলা

নাজিরুম মুবিন

জনে জনে সবাইকে পড়তে বলা যায় এরকম বই খুব কমই আছে। When Breath Becomes Air সেরকমই একটি বই। নিউরোসার্জন পল ক্যালানিথি (Paul Kalanithi) এই স্মৃতিকথায় শৈশব থেকে অপরিণত মৃত্যুর দিকে তার পথচলা তুলে ধরেছেন।

পল ক্যালানিথি স্ট্যানফোর্ডের নিউরোসার্জারির রেসিডেন্ট। অনার্স করেছেন হিউম্যান বায়োলজিতে, মাস্টার্স আবার ইংরেজি সাহিত্যে। দুটোই স্ট্যানফোর্ড থেকে। ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনে এমডি কোর্সে ঢোকার আগে ১ বছর সময় পান, সেই সময়ে ক্যামব্রিজ থেকে এমফিলটা সেরে ফেলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শনের উপর। ইয়েল থেকে এমডি করার পর নিউরোসার্জারির রেসিডেন্ট হিসেবে ঢোকেন স্ট্যানফোর্ডে। পলের স্ত্রী লুসি ক্যালানিথিও ইন্টারনাল মেডিসিনের রেসিডেন্ট হিসেবে স্ট্যানফোর্ডে যোগ দেন। (আমেরিকার মেডিকেল এডুকেশন সিস্টেম বাংলাদেশের মতো নয়। বাংলাদেশ ব্রিটিশ সিস্টেম ফলো করে।) ইয়েলে থাকতেই পল তার সহপাঠী লুসিকে বিয়ে করে। রেসিডেন্সি ট্রেনিংএর সময় পল নিউরোসায়েন্সের উপর পোস্ট ডক্টোরাল ফেলোশিপ করেন। গবেষণার জন্য সর্বোচ্চ সম্মাননাও পান।

মোটকথা পল ক্যালানিথি একজন অসম্ভব মেধাবী। তার সময়ে তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন।

পলের বয়স এখন ৩৫। দীর্ঘ ক্লান্তিকর রেসিডেন্সি ট্রেনিং এর আর মাত্র এক বছর বাকি আছে। এরপর স্বস্তি। পল স্বপ্ন দেখে, সে তখন তার পুরনো ভালোবাসা সাহিত্যকে সময় দিবে। নিউরোসায়েন্সের গবেষণায় সময় দিবে। আর নিউরোসার্জারির প্রফেসর হিসেবে জটিল ও কঠিন সার্জারিগুলো তো করবেই। অর্থ, সম্মান, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতার কোন অভাব থাকবে না। লুসির সাথে পুরনো পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটা বাচ্চাও নেওয়া হবে তখন।

পল একটা সিটি স্ক্যান দেখছে। ফুসফুসের ক্যান্সার। ফুসফুস থেকে ইতোমধ্যে হাড়ে, লিভারে ছড়িয়ে পড়েছে রোগটি। একবারেই লাস্ট স্টেজ। এরকম সিটি স্ক্যান তাকে প্রতিদিনই দেখতে হয়। রোগী ও তাদের আপনজনদেরকে দুঃসংবাদ জানাতে হয়। কিন্তু এই সিটি স্ক্যানটা ঘুরে ফিরে বারবার সে দেখছে। কারণ, এটা তার নিজের সিটি স্ক্যান। ডা. পল ক্যালানিথির মৃত্যু পরোয়ানা।

পল কি আর সার্জারি করতে পারবে না? নিউরোসার্জারির রেসিডেন্সি কি সে শেষ করতে পারবে না? তার ১০ বছরের পরিশ্রম, স্বপ্ন একজন নিউরোসার্জন হওয়া, তা কি অধরাই থেকে যাবে?
লুসির সাথে তার শেষের দিনগুলো ভালো যাচ্ছিল না। লুসি কি ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে পলের পাশে থাকবে?
এই পৃথিবীতে পল কি তার বংশ প্রদীপ জ্বালিয়ে যেতে পারবে না?
সাহিত্য কর্ম? কোন সাহিত্য কর্ম কি তার দ্বারা আর করা সম্ভব?
অনকোলজিস্টইবা তাকে কেন বলছে না, সে আর কয় দিন বেঁচে থাকবে?

প্রতিটা মেডিকেল স্টুডেন্টের এই বইটা পড়া উচিত। অ্যানাটমির ডিসেকশনের রুমের প্রতিটা ক্যাডাভারের প্রতি সম্মান বেড়ে যাবে।
প্রতিটা ডাক্তারের এই বই পড়া উচিত। ডাক্তার যখন রোগী হয়, হাসপাতালে ভর্তি হয় তখন তার মনোজগতে কেমন পরিবর্তন হয় তা কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।
প্রতিটা ক্যান্সার রোগীর এই বই পড়া উচিত। ক্যান্সার মানেই হাল ছেড়ে দেয়া নয় বরং নতুন উদ্যমে পাল উড়িয়ে দেয়া।
সবশেষে প্রতিটা অনকোলজিস্টের (ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) শুধু পড়া নয় এই বইটা সংগ্রহে রাখা উচিত। আমেরিকান সোসাইটি ফর ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট গত বছর তাদের বার্ষিক সম্মেলনে এই বইয়ের উপর একটি সেশন রাখে। ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশ্বের সবচে’ বড় হাসপাতাল মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টার তার সকল ট্রেইনি ডাক্তারের জন্য এই বই পড়া বাধ্যতামূলক করেছে।

পলের অনকোলজিস্ট এমির কাউন্সেলিংএর অংশগুলো আমি বারবার পড়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে কেমোথেরাপি শিডিউল, রেডিওথেরাপি প্ল্যানিং একজন অনকোলজিস্টের একেবারেই গৌণ কাজ। মুখ্য কাজ হচ্ছে, প্রতিটি ক্যান্সার রোগীর বেঁচে থাকা সময়ের জন্য তার অভিভাবক হয়ে যাওয়া। পল যখন আইসিইউতে ভর্তি ছিল, ইনটেনসিভিস্ট, নিউরোলজিস্ট, গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজিস্টরা তাকে বারে বারে এসে দেখে যাচ্ছিল। কিন্তু সে শুধু ভাবছিল, অনকোলজিস্ট এমি এসে তাকে একবার দেখে যাচ্ছে না কেন? এমি আসলেই সে ভালো হয়ে যেত। আমার এফসিপিএস ট্রেনিং সুপারভাইজার প্রফেসর ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক স্যার (Golam Mohiuddin Faruque) বলেন, “তখনই তুমি একজন ভালো অনকোলজিস্ট হতে পারবে যখন রোগীর জানাযায়, চেহলামে, শ্রাদ্ধে তোমাকে ডাকা হবে।”

এতটুকু পড়ে অনেকের কাছে মনে হতে পারে বইটা মৃত্যু নিয়ে কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে বইটা যতটা না মৃত্যু নিয়ে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি বেঁচে থাকা নিয়ে। জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের এক কাব্যিক পথচলা নিয়ে।

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close