বই বার্তা

কৃষণ চন্দরের গাদ্দারঃ একটি সোনালি বাঁশি

নাজিরুম মুবিন

কৃষণ চন্দরের পিকনিক আমার জীবনের একদম প্রথম দিকের পড়া বই। বইটা ছিল আব্বার। স্কুল জীবনে বৃত্তির টাকা দিয়ে কিনেছিলেন।

এরপর দীর্ঘ বিরতি। ক্ষৃণ চন্দরের সাথে আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। এই বছর একুশে বই মেলায় ডা. সজল ভাই ক্ষৃণ চন্দরের গাদ্দার বইটা উপহার দেন। বইটার নাম এর আগে শুনলেও কখনো পড়া হয়নি। দেশ বিভাগের উপর লেখা উপন্যাস শুনে আগ্রহ কমে যায়। ফেলে রেখেছিলাম অনেক দিন। দেশ বিভাগের উপর আমার পড়া গল্প, উপন্যাস সবগুলি পূর্বের দেশ বিভাগ নিয়ে লেখা। বেশীরভাগই বড্ড একতরফা। আমার দাদুর মুখে দেশ বিভাগের যে কাহিনী শুনেছি তার সাথে মোটেও মিলে না। কিন্তু আমার পূর্বপুরুষ, আমার দাদুরা দেশ বিভাগের সরাসরি ভিক্টিম। আমাদের আদি নিবাস ছিল ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরে। যখন দাঙ্গা শুরু হয় আব্বার দাদি তখন ভয়ানক অসুস্থ। আব্বার দাদু তখন তার অসুস্থ স্ত্রী নিয়ে না পারছেন পাকিস্তানে ঢুকতে না পারছেন ভারতে থাকতে। আমাদের থানাটা ভারতে থাকবে না পাকিস্তানে থাকবে সেটা নিয়েও বিতর্ক ছিল। ফলে দুই পক্ষই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। প্রতিরাতে আমাদের বাড়িতে লুট হতো। মাইগ্রেট করার সময়ও ফুরিয়ে আসছিল। দাদুর চাচারা একেকজন একেকজন একেক দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেন। এরই মধ্যে দাদুর মা মারা গেলেন। তাঁকে ভারতেই সমাহিত করে দাদুরা পাকিস্তানে মাইগ্রেট করলেন। মাইগ্রেট করার পথেও হামলা, লুট তরাজের স্বীকার হলেন। এই কাহিনীগুলো কোথাও উঠে আসেনি। পশ্চিমবঙ্গ কিংবা বাংলাদেশ, হিন্দু কিংবা মুসলিম কোন লেখকই মুদ্রার অপর পাশের এই চিত্রগুলো তুলে ধরেননি। এজন্য দেশ বিভাগ শুনলেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।

গাদ্দার এই দিক থেকে অন্যরকম। মুদ্রার দুই পাশের চিত্রই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ক্ষৃণ চন্দর। আবার এর কাহিনী পূর্বের নয় বরং পশ্চিমের দেশ বিভাগের। দাদুর বলা ইতিহাসের সাথে সমন্বয় করতে পেরেছি এই জন্য হয়ত বেশি ভালো লেগেছে।

গাদ্দারের কেন্দ্রীয় চরিত্র বৈজনাথ। তার ভাষ্যেই এগিয়ে চলে গাদ্দারের কাহিনী। যদিও চরিত্রটি মোটেও নায়কোচিত না। উচ্চ ঘরের শিক্ষিত যুবক বৈজনাথ স্ত্রী সন্তান থাকা সত্ত্বেও মুসলিম মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাতে থাকে। এই মেয়েই তাকে মুসলমান দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে লাহোরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। লাহোরে গিয়ে সে দেখে তাদের বাসায় কেউ নেই। লাহোরেও তখন দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। সে তার এক মুসলমান বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নেয়। বন্ধু তার সন্তানদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বৈজনাথকে লাহোর থেকে তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সেখানেও মুসলমান দাঙ্গাবাজরা আক্রমণ চালায়। বৈজনাথের দাদাসহ অনেকেই মারা যায়। স্ত্রী, ছেলে মুন্নার কোন খোঁজ পায় না সে। বন্ধু-স্বজনহীন বৈজনাথ বাঁচার একটাই রাস্তা দেখে। ইরাবতী নদীর উপরের ব্রিজে পৌছানো। এরপর ব্রিজ হয়ে ভারতে প্রবেশ করা। কিন্তু এই পুরো পথ জুড়ে উৎ পেতে আছে মুসলমান দাঙ্গাবাজরা। তার এই ভয়ংকর যাত্রার সঙ্গী হয় পোষা কুকুর রুমি।

গাদ্দার’কে সবাই উপন্যাস বললেও এর আকার মোটেও উপন্যাসের মতো নয়। আমার মতে বড় গল্প বলা যেতে পারে। উর্দু থেকে সরাসরি অনুবাদ করেছেন আনোয়ারা বেগম। প্রকাশনী মুক্তধারা। মূল্য ১২০টাকা।

পাদটীকাঃ দেশ বিভাগের গল্প উপন্যাস পড়ে দেশ বিভাগের রাজনীতি জানার চেষ্টা বোকামি। সেই সময়ের নিপীড়িত মানুষদের দুঃখ বেদনা অনুভব করার একটা উপায় মাত্র এই গল্প উপন্যাসগুলি।

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close