প্রবন্ধ

চলতে ফিরতে

মুহাম্মদ আব্দুল খালিক

প্রত্যেক মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কেউই নিখুঁত নয়, নয় ভুলের উর্ধ্বে। সাফল্য-ব্যর্থতা মিলিয়েই মানুষ। চলার পথে মানুষকে পেরুতে হয় অনেক বাধা-বিপত্তি, পাড়ি দিতে হয় অনেক বন্ধুর পথ। কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় সাফল্যের এক একটি সিঁড়ি। কেউ কেউ মাঝে মাঝে পা পিছলিয়ে পড়ে, তখন তাদের প্রয়োজন হয় মানসিক সহযোগিতার। কেউ কেউ হারিয়ে বসে তাদের গন্তব্যপথ, তখন তাদের প্রয়োজন হয় গাইড লাইনের। কেউ কেউ পড়ে খুব বেশি আর্থিক অনটনে, তখন প্রয়োজন হয় আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবার। কিন্তু আমাদের সমাজে আমরা কী চিত্র দেখি? জীবন যুদ্ধের তরুণযোদ্ধাদের সাথে কী আচরণ করে থাকে আমাদের সমাজ? তাদের এগিয়ে যাবার পথে আমরা কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রেখে থাকি? নেতিবাচক ভূমিকা রাখার মাত্রাটাই বা কেমন?

আমাদের সমাজে নেতিবাচক আচরণের মাত্রার বাহুল্যতা লক্ষণীয়। এখানে সমালোচনা হয় বেশি, কিন্তু তা গঠনমূলক নয়। কাউকে নিরুৎসাহিত করার জন্য যাবতীয় আয়োজন থাকে সে সমালোচনায়। কখনো কখনো এই সব সমালোচনাকারীরা ন্যূনতম মাত্রাবোধ মেনে চলে না। কেউ ভালো বক্তৃতা বা বিতর্ক করতে পারে, কিন্তু সে ভালো গান গাইতে পারে নাÑএটা থাকে সমালোচনার বিষয়। কেউ ভালো কবিতা লিখতে পারে, কিন্তু সে ভালো প্রবন্ধ লিখতে পারে না- এটা হয়ে ওঠে মুখ্য বিষয়। কেউ খুব মেধাবী ছাত্র, গবেষণাধর্মী কাজে সে পারদর্শী বেশি, কিন্তু সে ভালো বক্তৃতা করতে পারে না- এটা হয়ে ওঠে আলোচনার মূল বিষয়। কেউ তার ক্লাসের দেড়শ’ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছে, কিন্তু প্রথম হতে পারল না কেন-সেটাই তাকে শুনতে হয় বার বার। কোনো মেয়ে খুব প্রতিভাবান, কিন্তু সে কেন দেখতে সুশ্রী নয় (তাদের দৃষ্টিতে)- এই সমালোচনার তীরই বিদ্ধ করবে ঐ মেয়েটাকে বেশি। কোনো ছেলে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে খুব পারদর্শী, কিন্তু তার একাডেমিক রেজাল্ট খুব একটা ভালো নয়- এই জন্য তাকে হেস্তনেস্ত করা হয় নিয়মিত। এসবই আমাদের সমাজের মানসিকতার এক একটি নজির।

বেশির ভাগ মানুষই একে অপরকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্রব্যতুল্য মনে করে। একটি দ্রব্যের উপযোগিতা যতদিন থাকে ততদিন যেমন মানুষ ঐ দ্রব্যটি ব্যবহার করে, ঠিক তেমনি মানুষও যেন সম্পর্ক তৈরি ও রক্ষার ক্ষেত্রে উপযোগিতার বিষয়টি মাথায় রাখে। উপযোগিতা যতদিন আছে ততদিন সম্পর্ক অটুট থাকে, উপযোগিতা ফুরালে সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। আমাদের সমাজে লোকজন আপনাকে ব্যবহার করতে চায় বেশি। কাজে-অকাজে যেখানেই লাগুক না কেন আপনাকে লোকজন ব্যবহার করে চলবে। আপনার কিসে মঙ্গল-অমঙ্গল এই চিন্তা তাদের মুখ্য নয়।

আবার সমাজের বেশির ভাগ মানুষের সম্পর্কই যেন অর্থনীতির ‘যোগান বিধি’ মেনে চলে। দাম বাড়লে যোগান বাড়ে, দাম কমলে যোগান কমে। মানুষের সম্পর্কও যেন এই সূত্রে আটকা থাকে। আপনার দাম বেশি থাকলে বন্ধু-শুভাকাক্সক্ষীর অভাব হবে না, কিন্তু আপনার দাম কমতে থাকলে অন্তরঙ্গ সেই বন্ধু-শুভাকাক্সক্ষীদেরও আর খুঁজে পাবেন না।

আমাদের অনেকেই হয়তো এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। আবার নিজের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে আমরাও হয়তো নেতিবাচক এই সমাজের এক একটা অংশ হয়ে ওঠি। অনেক সময় এই নেতিবাচক কার্যকলাপ মানসিক অত্যাচারের পর্যায়ে চলে যায়। আবার সহযোগিতার অভাবে অনেক সম্ভাবনায় তরুণ ঝরে পড়ে অকালে। সামাজিক বিশৃঙ্খলতার মূলেও এটা কাজ করে থাকে। জাতি হিসেবে আমাদের অনগ্রসরতা বা অনৈক্যের পেছনেও কাজ করে থাকে এসব বিষয়।

কেন আমাদের মধ্যে নেতিবাচক সমালোচনা করার প্রবণতা বেশি? কেন আমরা অন্যকে উৎসাহিত করতে পছন্দ করি না? কেন আমরা পরশ্রীকাতরতায় ভুগি? কেন আমরা এটা চাই না যে, আমার মতো করে অন্য ছেলেও এগিয়ে যাক সম্ভাবনার পানে, সেও উঠুক সাফল্যের চূড়ায়? তার বিষন্নতা ও দুঃশ্চিন্তার সময়গুলোতে কেন আমরা বাড়িয়ে দিতে পছন্দ করি না সহযোগিতার হাত? এই বিষয়গুলো গবেষণার দাবি রাখে। আর এগুলো থেকে আশু উত্তোরণও আমাদের প্রয়োজন।

আবার বিপরীতে ইতিবাচকতার বিস্তৃতি ঘটানো লোকের উপস্থিতিও বিরাজমান। তারা শত হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখেন। শত কষ্টের মধ্যেও সম্ভাবনার কথা বলেন। শত অনটনের মধ্যেও সমৃদ্ধির পথ দেখান। শত বিপর্যয়ের মধ্যেও পাহাড়ের মতো অটল থেকে পরিস্থিতি সামাল দেন। এসব লোকের স্বল্পতা যে আমাদের সমাজে রয়েছে তা চিন্তাশীল লোকমাত্রই অনুধাবন করে থাকে। তবু এই স্বল্প সংখ্যক লোকের জন্যই যেন শীতের শেষে বসন্তের দেখা মেলে, গ্রীষ্মের খরতাপে দগ্ধ হওয়ার পর আষাঢ়ের বৃষ্টির ঝাপটায় শীতলতার খোঁজ মেলে। এই সব লোকেরাই যেন চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে আগলে রাখেন হতাশাবাদীদের কবল থেকে।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close