নিজের কথা

শেষ বিকালের ট্রেন যাত্রা

তাসিন, অর্ণব

বিকাল গড়িয়ে চলছে। সূর্য অনেকটা গন্তব্যের কাছাকাছি। আমরা দুই কিশোর ছুটলাম স্টেশনের দিকে। কমলাপুর রেল স্টেশন। ট্রেনের ঝক-ঝকা-ঝক শব্দ কানের ভিতর এক অন্যরকম আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমাদের বেরুনোর উদ্দেশ্যে ট্রেন আর স্টেশন ঘুরে ফিরে দেখা।

বিকালে স্টেশনে পৌঁছেই আশে-পাশের অবস্থা ঘুরে ফিরে দেখা শুরু করলাম। দু’জনের ভাবটাই ছিল যেন রেলওয়ে প্রকৌশলী! চোখে তখন আগ্রহের আর অন্ত নেই। হঠাৎ এক কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই কোথায় যাবেন?
-কমলাপুর থেকে উত্তরা। কর্মকতা বললেন, উঠুন। ভাড়া কত জিজ্ঞাস করলে বললেন, সত্তর টাকা।
বললাম- আমরা ছাত্র মানুষ ত্রিশ টাকার বেশী দিতে পারবো না। কর্মকর্তা বললেন, উঠুন।

যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে না হচ্ছে না এসব চিন্তা না করেই দু’জন ট্রেনে উঠে গেলাম। ট্রেনে যাচ্ছি এটাই বড় কথা। ঝক-ঝকা-ঝক ট্রেন এবার চলা শুরু করলো। আমরা দুজন নিজেদের সিটে বসে গেলাম। আর সন্ধানী চোখ দিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য, জনবহুল ঢাকার দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম। কিন্তু হঠাৎ দেখি যাত্রা শেষ। মাত্র আধাঘন্টার যাত্রা। নেমে গেলাম রেলস্টেশনে। যখন নামলাম তখন মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে মাগরিবের আযান।

এবার ফেরার পালা চলে আসলো। হাতে খুব বেশী সময়ও নেই। মনে ভিতর কিছুটা ভয়ও কাজ করছিলো। ট্রেন আসতেই ৩ নম্বর বগিতে লাফিয়ে উঠলাম আমরা। মনে হলো উচ্চ লাফের প্রতিযোগী। অনেকটা বিজয়ীর মতো ট্রেনে উঠলেও এবার ঝুলে যাবার পালা। এ ঝুলার মজাই আলাদা। দুই স্টেশনে থামার পর পৌঁছলাম কমলাপুরে। আমার এবার নেমে পড়লাম। হিন্দি ছায়াছবির নায়কের মতো ট্রেনে উঠা বা নামা মনে হলো হাতের তুড়ির মতো। আমরা দুই নায়ক নেমে দৌঁড় প্রতিযোগিতা আরম্ভ করলাম। বিপক্ষ প্রতিযোগী ট্রেন।

স্টেশনে গেট পারাপারে সবাই চলে গেল। রেলওয়ে পুলিশ আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, টিকিট দেখা। কিছুটা কিঞ্চিত বিরক্তি প্রকাশ করে আমরা বললাম, টিকিট নাই, টাকা নেন। ট্রেনে কেউ টাকা চায় নাই।

তারপর যা ঘটলো তা মোটেও কাম্য ছিলো না। দু’জনকে নিয়ে সরাসরি ছোটখাট রিমান্ড। এবার বললো-হয় দুই হাজার টাকা দিবি, নয়তো জেলে ঢুকিয়ে দেবো। আমরা তখনো জানিনা কর্মকর্তাদের মূলত কাজটা কি। ভয়ে মুখ তখন একেবারে চুপসে গেলো। হাবিলদার এলো লাঠি নিয়ে মারার জন্য। আমরা আকুতি করে বললাম-
‘আমরা হোস্টেলে থাকি, ছাত্র। স্যার আমরা এতো টাকা কিভাবে পাবো। আপনি আসল ভাড়াটা নিন।’ তাদের পাল্টা উত্তর- তোরা কোথা থেকে উঠলি, আমরা জানবো কি করে, প্রমাণ কি?

আমাদের কাছে আসলে তখন প্রমাণ ছিলো না। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, প্রমাণ রাখার দায়িত্ব কি আমাদের না রেল কর্তৃপক্ষের। তারপই যা শুরু হলো তা ছিলো- লুটতরাজ। পকেট, মানিব্যাগ থেকে সব টাকা রেখে দিল। আমাদের আর মাসের খরচটাও রইলো না। সেদিনের ট্রেন ভ্রমণের শেষে আরেকটা প্রশ্ন থেকে গিয়েছিলো। আর সেটা হলো- দুর্নীতি দিয়ে কি মনুষ্যত্ববোধের পরিমাপ হয়। এ রেলওয়ে দুর্নীতি কি বন্ধ হতে পারে না?

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close