চিঠি ঘর

আমাদের গেছে যে দিন

ওয়ালিদ প্রত্যয়

কিছুক্ষণ আগে রানুর চিঠি লেখা শেষ হয়েছে। তার কাছে মনে হচ্ছে- চিঠিটা যথেষ্ঠ ভালো হয়নি। প্রেমিককে চিঠি লিখতে হলে অনেক গুছিয়ে লিখতে হয়, রোমান্টিক কথা লিখতে হয়। আফসোস, রানু গুছিয়ে কিছু লিখতে পারে না। সে যখন অবসরে থাকে তখন অনেক রোমান্টিক কথা মনে আসে, মনে হয়- পরবর্তী চিঠিতে তাকে এই লিখবো , সেই লিখবো। অথচ চিঠি লিখতে বসলে সেই সব কথা কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। কি মুশকিল!

রানু চিঠিটা বেশ কয়েকবার কাটাকাটি করে বাড়ির কাজের লোককে ডেকে বলল, যাও, ওকে চিঠিটা দিয়ে আসবে, গোপনে। এই নাও দুই টাকা।

রানু যাকে ভালোবেসে প্রায়ই গোপনে চিঠি পাঠায়, সেই মানুষটা সারাদিন কিসব যেনো লেখে, তাঁর অনেকগুলো বই বাজারে পাওয়া যায়। মানুষটার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার বয়স ছাপান্ন, রানুর তখন উনিশ।

কাজের লোকটা রানুর প্রেমিকের বাড়ি এসে দেখলো- রবিঠাকুর জলচৌকিতে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেনো লিখছেন। এমতাবস্থায় তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। তবুও সাহস করে কাছে গিয়ে বলল, দাদাবাবু, দিদি একটা পত্র পাঠিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ পত্র হাতে নিয়ে বললেন, আচ্ছা।

মধ্যরাত। রবীন্দ্রনাথ রানুর চিঠি পড়তে বসেছেন। বাচ্চা বাচ্চা গোটা গোটা হাতের লেখা। রানু লিখেছে- আপনার আমার বয়সের তফাৎ বড্ড বেশি। শুনুন, কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে আপনার বয়স কত- আপনি বলবেন সাতাশ। এতে তফাৎটা একটু কমে।

রবীন্দ্রনাথ চিঠির জবাবে লিখলেন- বয়স যখন কমিয়েই ফেলবো , তুমি অনুমতি দিলে আরেক বছর কমিয়ে দিই। সাতাশ না বলে ছাব্বিশ বলি। সাতাশ বললে মানুষ আবার সাতাশি ভেবে না বসে! কাজেই ছাব্বিশ বললে এই ভয়টা থাকে না।

কলকাতার রঙ্গমঞ্চে ‘বিসর্জন’ নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। জয়সিংহের চরিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিনয় করবেন। অপর্ণার সাজে রানু বসে আছে। দর্শক মুগ্ধ হয়ে অসমবয়সী এই জুটিকে দেখলো।

তার কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথ রানুকে লিখলেন, বিধাতা আমাকে একলা করে দিয়েছলেন। তুমি আমার একাকিত্বে এসে বাসা বেঁধেছো। তোমার এই আসা আমার কর্মে রসদ জুগিয়েছে, আমাকে আনন্দ দিয়েছে। রানু, তোমাকে ধন্যবাদ।

রানুর এই চিঠি পড়ে কেমন লেগেছিলো, মাঝে মাঝে জানতে খুব ইচ্ছে হয়। রানু অভিমান ভরা হৃদয়ে উত্তর দিলেন, আপনার আমার তো মনে মনে বিয়ে হয়েই গিয়েছে, আপনার আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছেন আমার সমস্ত মন-প্রাণ-দেহ। এই গোপনীয়তাটুকু একান্তই আমাদের। এটা জানার অধিকার তো কারোর নেই।

রানু অন্য কাউকে বিয়ে করেছিলেন, তবুও রবীন্দ্র-বলয় থেকে বের হতে পারেন নি। সারাজীবন কাটিয়েছেন ‘দূর হতে আমি তারে দেখিবো’ টাইপেই বেদনা নিয়ে।

রবীন্দ্র-প্রেমিকারা কেমন যেন মায়াবি ধরনের হয়। যেন তারা সকলেই কাছের-দিনের-ছোঁয়াচ-পার-হওয়া-চাহনিতে জানলার বাইরে চেয়ে থাকে। তারা সবাই রবীন্দ্রনাথের কাব্যিক এবং কাল্পনিক প্রেমে অভ্যস্ত।

রানু-রবীন্দ্র শিলং বেড়াতে গিয়েছিলেন অনেক আগে। একে অন্যকে ভালোবেসে দূরে ঠেলে দিলেন। এই থিম নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে একটা উপন্যাস লিখলেন, নাম দিলেন- শেষের কবিতা।

আমি কল্পনা করে নেই, একদিন হয়ত কোনো একটা লোকাল ট্রেনে রবীন্দ্রনাথের সাথে রানুর দেখা হয়ে যাবে। অল্পস্বল্প কথার মাঝে রানু হয়ত জিজ্ঞেস করে বসবে- আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?

১৫৭ তম জন্মজয়ন্তীতে কবিগুরুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close