ঘুরে-ফিরে

সেজু, বিভূতি এবং স্রোডিঞ্জার

নাজিরুম মুবিন

আমার হাঁটাহাঁটির বাতিক আছে। হাঁটতে ভালো লাগে। হাঁটতে গিয়ে যেই পথগুলো মনে ধরে সেই পথগুলোতে বারবার হাঁটি। প্রিয় পথগুলোর একটি হচ্ছে সিলেটের এয়ারপোর্ট রোড। আম্বরখানা থেকে লাক্কাতুরা পর্যন্ত অটোরিক্সায় যাই। লাক্কাতুরায় নেমে সোজা রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করি। যতদূর যাওয়া যায়। এই রাস্তা একেবারে বাদাঘাট গিয়ে শেষ হয়েছে।

আজ সকালে প্রিয় পথ ধরে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। সাথে ছিল নাফি। সাস্টের ফিজিক্সের ছাত্র। লাক্কাতুরা থেকে রাস্তার দুই পাশে দুই নামে দুই চা বাগান শুরু হয়। বামপাশে মালনীছড়া চা বাগান। ডানপাশে লাক্কাতুরা চা বাগান। মালনীছড়া চা বাগান ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো চা বাগান। ১৮৫৪ সালে এখানে চা চাষ শুরু হয়।

শুষ্ক মৌসুমে চা বাগানগুলোর মন খারাপ থাকে। স্কুলগামী শিশুদের মাথা ন্যাড়া করে দিলে তাদের মন যেমন খারাপ থাকে সেরকম। গাছে নতুন পাতা নেই, কুঁড়ি নেই। চা শ্রমিকদের আনাগোনা নেই। কেমন যেন শূণ্যতা। চা বাগানের মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু ছায়াবৃক্ষ। চা গাছগুলোকে ছায়া দেয়া তার কাজ। ছায়াবৃক্ষগুলো সাধারণত ক্রান্তীয় চিরসবুজ বৃক্ষ। শীতকালে তাদের পাতা ঝরে পড়ে না। চা গাছগুলোর মন ভালো করার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না। এই মন খারাপ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় এক পশলা বৃষ্টি। আজকের একটুখানি বৃষ্টি আগামীকাল এই পুরো এলাকাকে সবুজে সবুজে ভরিয়ে দিবে। দৃশ্যমান মৃত ডাল থেকে সবুজ পাতা উঁকি দিবে। দূর থেকে দেখে মনে হবে ঢেউ খেলানো সবুজ গালিচা।

মালনীছড়া চা বাগানের সীমানা শেষ হয়। শুরু হয় আলীবাহার চা বাগান। এই পথ ধরে কিছুদূর এগুলেই হাতের বামে বাংলাদেশের প্রথম বন বিদ্যালয়। ১৯৪৮সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কিছু অবকাঠামো নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপরে নতুন কিছু নির্মাণ হয়েছে বলেও মনে হয় না। প্রায় সবই এখন পরিত্যক্ত। মানুষ থাকে না দেখে বানররা এসে দখল নিয়েছে। কিছুদিন আগে বন বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ফরেস্ট্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউট রাখা হয়েছে। ফরেস্ট রেঞ্জার, অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এখানে।

বন বিদ্যালয়ের ভিতরের রাস্তা ধরে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার ধারে বসে একটা ছেলে রোদ পোহাচ্ছে। আশেপাশে আর কেউ নেই। দূরত্ব কমে আসায় তার হাতে রাখা বই চোখে পড়ল। কী বই বুঝা যাচ্ছে না। ছেলেটাকে অতিক্রম করার সময় বইয়ের নাম দেখে আমি আর নাফি দুইজনই বেশ অবাক হলাম। ছেলেটার হাতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড়। বইটা বন্ধ ছিল। খুলে রাখলে নামটা দেখতে পেতাম না। ছেলেটার কাছে এগিয়ে গেলাম কথা বলার জন্য।

সেজু আহমদের জন্ম এই বন বিদ্যালয়ে। বাবা এখানকার কর্মচারী ছিলেন। গত হয়েছেন বছর ছয়েক হলো। সেজু কিন্তু ভাই-বোনদের মধ্যে সেজ না। সবার ছোট। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। সেজু তার মায়ের সাথে এখানে থাকে। আগামী দুই তারিখ থেকে তার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে।

সেজুর পুরো শৈশব কৈশোর কেটেছে এই বন বিদ্যালয়ে। সমবয়সী কোন বন্ধু নেই তার। বন বিদ্যালয় ও এর আশেপাশের উঁচু নিচু টিলা, টিলার ঢালে বেড়ে ওঠা বিভিন্ন উচ্চতার গাছ, গাছের গা জড়িয়ে থাকা অর্কিড, মসজিদের সামনের শান বাঁধানো বড় পুকুরটা, পুকুরের পাড়ে সুপারি গাছের সারি, বানর, কাঠবিড়ালি, ঘুঘু এই ছিল তার বেড়ে ওঠার সঙ্গী। এখন চুলগুলো হাল ফ্যাশনে কাটা হলেও প্রকৃতির সাথে এখনো মিশে আছে তার সত্তা।

নিসর্গের আরেক প্রেমিক বিভূতিভূষণের সাথে সেজুর কিছুদিন আগে পরিচয় হয়েছে। পরীক্ষা সামনে তবুও কোত্থেকে যেন চাঁদের পাহাড় যোগাড় করে ফেলেছে। আমরা ভাবি, পরীক্ষা শেষে চাঁদের পাহাড়ের শংকরের মতো সেও হয়তো কোন অভিযানে বের হবে। সেজু যদি শংকর না হয় তবে আর কে হবে?
“আম্মা কইছইন পরীক্ষা বাদে কম্পিউটার হিকতাম। মামা একজন সৌদি আছইন। কম্পিউটার হিকা থাকলে তাইন সৌদিত চাকরি লইয়া দিবা।” সেজু আমাদের ভাবনাকে আর সামনে এগুতে দেয় না। যে ছেলেটা জন্ম থেকে সবুজের কোলে, ছায়ার মায়ায় আজ পর্যন্ত লালিত, যে ছেলে বিভূতিভূষণ পড়ে, সে কিনা বৃক্ষহীন, ছায়াহীন, তপ্ত মরুর বুকে যন্ত্রের সাথে বাকি জীবন কাটাবে। চিন্তা করতেই মনটা খারাপ হয়ে যায়।

আচ্ছা, সেজুতো বিভূতিভূষণের আরণ্যকের সত্যচরণ হতে পারতো। এস্টেটের ম্যানেজার না হোক তার বাবার মতো এই বন বিদ্যালয়ের একটা ছা-পোষা চাকরি তো জুটিয়ে ফেলতে পারতো। আমাদের এই সম্ভাবনাকেও নাকচ করে দেয় সেজু। সে এই ব্যাপারে আগেই খোঁজ খবর নিয়েছে, “ইনো চাকরি পাইতে অইলে লিংক লাগে, টেকা লাগে।” সেজুর গলায় দীনতার স্বর। হীনতার সুর। আমরা আর কথা বাড়াই না। ফিরতি পথ ধরি। ১১টার সময় নাফির ক্লাস আছে।

জমিদার পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন গলা ছেড়ে বলতে পারে-
“মা যদি হও রাজি,
বড় হয়ে আমি হব খেয়া ঘাটের মাঝি।”
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ইস্কুল বন্ধু অমলকান্তি তেমনি ভাবে বলতে পারে না, আমি রোদ্দুর হতে চাই। নীরেন্দ্রনাথের জবানিতেই আমাদের শুনতে হয়-
“অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।”
তাই শেষ পর্যন্ত সে অন্ধকার ছাপাখানার শ্রমিক হয়। সেজুও মাথা উঁচু করে বলতে পারে না আমি সত্যচরণ হতে চাই, আমি শংকর হতে চাই।

চা বাগানের সাথে সাথে আজ আমার আর নাফিরও মন খারাপ।
“নাফি আজ তোমাদের কী পড়াবে?”
“স্রোডিঞ্জারের এক্সপেরিমেন্ট।”
“ওইযে বক্সের মধ্যে বিড়াল থাকে। ওই এক্সপেরিমেন্ট?”
“জ্বী ভাইয়া”
“আচ্ছা, এই এক্সপেরিমেন্টের আগা মাথা কিচ্ছু বুঝি নাই। অ্যাবসার্ড টাইপের এক্সপেরিমেন্ট।”
“ভাইয়া, আমাদের কলেজ পর্যন্ত যে ম্যাথ পড়ানো হয় তাতে এটা বুঝা সম্ভব না, আমরাও বুঝি না।”
মনে মনে বললাম, আমি এখন কিছুটা বুঝতে শুরু করেছি। প্রকৃতির সন্তান সেজু নগরের যান্ত্রিক বিষক্রিয়ায় যাওয়া মাত্র মারা যাবে। অথবা সে একই সাথে জীবিত বা মৃতরূপে থাকবে। কেউ দেখবে জীবিত। কেউ দেখবে প্রাণহীন মনুষ্য অবয়ব।

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close