গল্প

সংসার

মাইনুল হাসান শিমুল

তিন ভাইবোন। বড় বোন রুনা, তারপর আমি, ছোট বোনের নাম রুকু, ওহ হো, আমার নাম বলা হয়নি, রাজু। পুরোটা র বর্গীয় পরিবার। বাবার নাম রকিব উদ্দিন, মা রুকাইয়া।

এই নাম রাখা নিয়ে অনেক ঝামেলা,মা বলেন র দিয়ে নাম হওয়ায় তার জীবন টা শেষ হয়ে গিয়েছে,তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে আরেক র রকিব উদ্দিনের ঘাড়ে।

ছেলেমেয়েগুলোর নাম ও র দিয়ে রাখা হয়েছে,কে জানে তাদের কি অবস্থা হয়।

তবে এতে আমার খানিক দ্বিমত আছে, কারণ মায়ের নামের র এর পরে আছে ক,এবং বাবার নামের পরেও ক, র আর ক তে বোধহয় উনার জীবন শেষ। আমাদের মধ্যে রুকু শুধু এই ঝামেলায় পড়েছে,আমি আর রুনাপু এগুলোর মধ্যে নেই।

রুনাপু এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দিবে,ইডেনে একাউন্টিং নিয়ে পড়ছে,আমি দিবো মেট্রিক। আর রুকু ক্লাস সিক্সে পড়ে। রুকুর ভাব টা এমন যেন সে এই বাড়িতে সবচেয়ে বড়, এই বয়সে চশমা পড়ে সে যেভাবে হাঁটাহাঁটি করছে এবং সমানে আমাকে এবং রুনাপু কে ধমকে বেড়াচ্ছে তাকে সমীহ না করে উপায় নেই। তার চেয়ে বড় কথা মা রুকুর ফেভারে আছেন।

পান থেকে চুন খসলে মা আমাদের যেভাবে বকা ঝাড়ি দেন রুকু সে পান সহ ফেলে দিলেও মা তাকে তেমন কিছুই বলেন না। রুনাপুর এই নিয়ে মাথাব্যাথা নেই কারণ তিনি আছেন বাবার ফেভারে।

আমার মাথাব্যাথা কারণ আমি কারো ফেভারে নেই।

ইশ মিথ্যে বললাম,আমিও ফেভারে আছি,সেটা হচ্ছে আনজুর মার,আনজুর মা আমাদের বাড়িতে কাজ করেন আমার জন্মের আগ থেকে, রুকু আর আমি একরকম উনার কোলেপিঠেই মানুষ হয়েছি। আনজুর মার সম্পর্কে একটা ভয়াবহ তথ্য হলো আনজু নামে উনার কোনো সন্তান নেই। উনার স্বামী নাকি অনেক বছর আগেই উনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সন্তানাদিও উনার নাই,তাও উনাকে কেনো আনজুর মা ডাকা হয় সেটা একটি রহস্য,রহস্য কেউ উদঘাটন করতে পারে নি।

আমাদের বাবা রকিব উদ্দিন তিনি মানুষ হিসেবে মোটামুটি সফল,কাগজের বক্স বানানোর ব্যবসা থেকে শুরু করে আজ তিনি একটি প্রেস, একটি কাগজের মিল সহ আরো অনেক ব্যবসা করেন। আচ্ছা আচ্ছা,আমরা যে খুব ধনী তাও কিন্ত না। বাবার যখন ব্যবসা খারাপ যায় তখন তিনি খুব বিমর্ষ হয়ে থাকেন,আমাদেরো কিছু টানাটানি হয়। আর মা একাধারে আমার জীবন শেষ হয়ে গেলো,শেষ হয়ে গেলো করতে থাকেন।

মার জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার ব্যাপার টা পুরোপুরি সত্যি নয়,উনাকে যথেষ্ঠ সুখী বলে মনে হয়।
উনাকে দেখে কেউ তিন সন্তানের জননী ভাববে না,অনায়াসে উনাকে আরেকটি বিয়ে দেওয়া যাবে,
এই কথা বলে যদিও আমি একটা চড় খেয়েছিলাম। তবে মা যেভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজুগুজু করেন তাতে রুনাপুর আর মার মধ্যে খুব একটা ফারাক করা যায় না । মা পান খান,পৃথিবীতে বোধহয় এই এক জিনিষে তিনি শান্তি খুঁজে পান। পান খাওয়ার সময় তিনি কখনোই বলেন না যে তার জীবন শেষ হয়ে গেলো। এই কথা তিনি শুধু বাবার সাথে বলেন,বাবাকে সেই মূহুর্তে খুব সুখী মানুষ বলে মনে হয়,মার জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় মনে হয় তিনি আনন্দিত,আর এই ঘটনায় তাকে দায়ী করার জন্যে তিনি আরো বেশি উল্লসিত। সব মিলিয়ে তারা ঠিক কোন অবস্থায় আছে বোঝা যায় না।

এইতো সেদিন বাবা বাড়িতে ছিলেন,বাবা খুব একটা বাড়িতে থাকেন না। যেদিন বাবা বাড়িতে থাকেন সেদিন রুনাপুর উচ্ছাসের সীমা নেই,সেদিন সে কলেজে যাবে না, কোথাও যাবে না, রুকুও স্কুল যাবেনা বলে ঘোষণা করলেও সেটা মেনে নেওয়া হয় কিন্ত আমি স্কুলে যাবোনা বললে তা মা মেনে নিবে না,আশ্চর্য বৈষম্য।

ভাগ্যিস ওইদিন ছিলো ছুটির দিন,বাবা বললেন চলো তোমাদের চিড়িয়াখানা দেখিয়ে নিয়ে আসি,এই চিড়িয়াখানা দেখতে দেখতে আমরা বিরক্ত। বাবা চিনেই শুধু চিড়িয়াখানা, ঘুরেফিরে উনি আমাদের সেখানেই নিয়ে যান এবং জিরাফের সামনে গিয়ে জিরাফের মতো গলা উঁচু করার একটি ভান করেন। আমার বিরক্ত লাগে,মার ও লাগে,শুধু রুনাপু রুকু আর বাবা উপভোগ করেন ।

মা তো মাঝেমধ্যে বলেই ফেলেন যে বাবাও একটি চিড়িয়া বিশেষ,তাকে জিরাফের খাঁচায় আটকে না রাখার জন্যে তার জীবন টা শেষ হয়ে গেলো।

যাক ওইদিন আমাদের চিড়িয়াখানা যাওয়া লাগেনি কারণ মায়ের শরীর খারাপ,মাকে ছাড়া রুকু যাবে না, আমিও যাবোনা। তাই বাবার উৎসাহে ভাটা পড়লো,তিনি বাগানে বসে আগের দিনের পত্রিকা পড়তে লাগলেন,রুনাপু খানিক পর পর চা দিয়ে আসতে লাগলো। মহা উৎসাহে রুনাপু রান্নাবান্না করছে,আমার কাজ রুনাপু কে জোগান দেওয়া। রুকু মায়ের দেখাশোনা করছে।

রুনাপু আমায় ধমকের উপর রাখে,আমার এমন কি বয়েই গেছে তাকে রান্নাঘরে এটা সেটা এগিয়ে দেওয়ার,
আনজুর মা তো আছেই তাও আমি ধমক খাচ্ছি কারণ আমি রুনাপু কে অসম্ভব ভালোবাসি,আপুর কাছে কাছে থাকতে ইচ্ছে করে। কিন্ত আপু বোধহয় সেটা বুঝতে পারেনা,কাছে গেলেই ধমকায়।

তুই গোসল করিস না কয়দিন,মাথার মধ্যে এত ময়লা কোথা থেকে আসে? নখ কাটিস না ক্যান,লায়েক হয়েছিস?তোর জামার বোতাম ছেঁড়া কেনো,গেঞ্জি এটা কয়দিন ধরে দেখছি,পড়াশোনা তো দেখি কিছুই করছিস না,দাঁড়া আজ ই বাবাকে বলে তোকে শায়েস্তা করছি।
উফফফফ, এরপর কান মলা,সময়ে অসময়ে তো চড় থাপ্পড় আছেই। আপু কেনো এমন করে কে জানে। হুহ।

আপু খুব ভালো রান্না করে, বাবা যেদিন বাসায় থাকে সেদিন আপু স্পেশাল স্পেশাল রান্না করে। সেদিন ও আপু অনেক কিছু রান্না করলো, বাবা খেয়ে দেয়ে আমাদের নিয়ে মুভি দেখতে বসলেন,মুভির আইডিয়া আমার, নতুন একটি সায়েন্স ফিকশন মুভি রিলিজ হয়েছে , আমি দেখেছি এখন সবাইকে দেখাতে হবে তাই জোর করে বাবা আপুকে ডেকে এনে বসানো। হুট করে মা বাবাকে ডেকে উনাদের ঘরে নিয়ে গেলেন, সেখান থেকে উনাদের কথা কাটাকাটি, মায়ের ফোঁপানোর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমি কিছু না বুঝে হা করে মুভি দেখছি,ইদানীং বাবা মায়ের ঝগড়া টা খুব হচ্ছে। বাবার চাপা গলায় আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
-তুমি আমার ফোন ধরেছো কেনো?
-কেনো তোমার ফোন ধরতে পারবো না কেনো আমি,তুমি বাইরে এত কিছু করে বেড়াবে, আমি তোমার ফোন ধরতে পারবো না?
-না ধরবে না, আমি নিষেধ করলাম তুমি ফোন ধরবে না ব্যস ধরবে না।
-চিৎকার করবে না,ছিহ,লজ্জা করেনা? ছেলেমেয়েগুলো সব বড় হচ্ছে….
আমি কান পেতে শোনার চেষ্টা করছি,যদিও বাবা মায়ের ঝগড়া কান পেতে শোনা উচিত না,হুট করে রুনাপু টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিলো এবং উঠে এসে আমায় একটা থাপ্পড় মেরে তার নিজের ঘরে চলে গেলো।
আমি গাল ডলতে ডলতে রুকু কে বললাম,
-দেখলি,শুধু শুধু মারলো?
-ভালো হয়েছে,আরেকটা দেওয়া উচিত ছিলো,আমার বান্ধবী বলেছে এক গালে থাপ্পড় মারলে নাকি বিয়ে হয়না, তোমার বিয়ে হবেনা ভাইয়া।
রুকুটা এই বয়সে এত পাকা কথা কোথাথেকে শিখলো কে জানে। কথা না বাড়িয়ে আমি মুভির দিকে মনোযোগ দিলাম, কি ঘটবে আমি জানি, স্পেসশিপ ধ্বংস হয়ে যাবে, পৃথিবীটা এলিয়েন দ্বারা বেদখল হয়ে যাবে। মানুষ সব ছুটে পালাবে, এক পর্যায়ে নায়ক নায়িকাকে নিয়ে আরেকটা স্পেসশিপে করে পালানোর চেষ্টা করবে,এলিয়েন রা সেটাও ধ্বংস করে দেয়,ওই দৃশ্য দেখে আমি পাক্কা তিন মিনিট কেঁদেছিলাম,আমার মনে আছে।

বাবা মার ঝগড়া রাতের মধ্যেই মিটে গেলো, রাতে খেতে বসার সময় দেখলাম মা বাবার পাতে একটা বড় চিংড়ি মাছ তুলে দিচ্ছে,আমি টেবিলের নিচে রুকু কে একটা খোঁচা দিলাম,একটা হাসি হাসি মুখ করে রুকুর দিকে তাকালাম,রুকু গম্ভীর মুখে খাচ্ছে। দমে না গিয়ে আমি রুনাপুর দিকে তাকালাম,দেখি রুনাপু আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মন খারাপ হয়ে গেলো ধুর,আমায় কেউ একটু ভালোবাসেনা। একমাত্র আনজুর মা আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে আছে,আমি আনজুর মাকে মা বাবার দিকে ইশারা দিয়ে একটা বানর হাসি দিলাম।
বানর হাসি হচ্ছে সেই হাসি যাতে সব দাঁত দেখা যায়,
বাদ পড়বেনা একটি দাঁত ও। রুনাপু এই হাসির নাম রেখেছে বানর হাসি। আমি কৃতজ্ঞ, হনুমান রাখলে আমার খারাপ লাগতো। বানর পর্যন্ত সহ্য করা যায়!

রুনাপুকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি। সকাল বেলা ঘুম টা টুটিয়ে দেওয়ার জন্যে একজন বড় বোন যথেষ্ঠ,নিজে ঘুমাবে না, কাউকে ঘুমাতে দিবে না,হিংসুক। পড়তে বসার হুকুম দিয়ে চলে গেলো।
অংক টা ঠিক মাথায় ঢুকে না আমার, চেষ্টা করছি ঢুকানোর, বাবা মার আবার শুরু হলো।
খানিক বাদে আবার থেমেও গেলো। বোধহয় উনাদের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চলছে,মাঝেমধ্যে গোলাগুলি হয়,বেশিরভাগ সময়ে যুদ্ধবিরতি,মাঝখানে আবার মিলেমিশে থাকা এটা কি হতে পারে?
যুদ্ধবিরতির সময়? উহুম।
রুনাপু এলো,
-তোর এক্সাম কবে?পড়ছিস মন দিয়ে?
-সামনের মাসে আপু। পড়ছি তো।
-শোন আগামীকাল তোর কিছু কাজ আছে..
আমি নড়েচড়ে বসলাম,আপুর যেকোনো কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগে।
-বয়েই গেছে আমার তোমার কাজ করতে।
-দশ টাকা দিবো,আর কাজ টা আমার একার না, শোন আগামীকাল বাবা মায়ের বিবাহবার্ষিকী, তারা তো আর সেলেব্রেট করবে না,আমরা করবো,তুই কাল একটা কেক নিয়ে আসবি,কেক অর্ডার দেওয়া আছে,জাস্ট গিয়ে নিয়ে এসে লুকিয়ে রাখবি,বাবা এলে চমকে দিবো?
উত্তেজনায় আমার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা।
-কিরে হাঁদা চুপ করে আছিস কেনো,আপু ধমকে উঠলো।
-ঠিকাছে আমি নিয়ে আসবো, দশ টাকা কখন দিবে?
আপু হাই তুললো,
-তোর যা পেট,এটা আবার বলে বেড়াবি না , বললে সারপ্রাইজ নষ্ট হবে। রুকুকেও না।
-আচ্ছা বলবো না।
আপু গাল টিপে দিয়ে চলে গেলো। আপুটা এমন কেনো।


পড়ালেখা লাটে উঠলো,আমার মাথায় শুধু খেলা করছে কাল কত কি না হবে,আমি কি করবো,ইশ আপুর মাথায় কত বুদ্ধি, আমার মাথায় কিছুই আসছে না,আসলেই আমি একটা হাঁদা। আমি দৌড়ে রুকুর কাছে গেলাম,এত বড় ঘটনা পেটে রাখা যাচ্ছে না,রুকুর কাছে যেকোনো জিনিষ নিশ্চিন্তে বলা যায়,ওর পেট আমার মতো না,অনেক বড় বড় খবর ও জমা রাখতে পারে নিশ্চিন্তে।
রুকু কাগজ কেটে কেটে কি বানাচ্ছে,আমাকে দরজায় দেখেই সব লুকিয়ে ফেললো,খানিক সন্দেহ হলো।
-কি করছিস রে রুকু তুই?
-কি করছি তা তোমাকে বলবো নাকি,আমি কাজ করছি রুম থেকে বেরোও,দরজা লাগাবো আমি।
– আমি আম্মুকে এক্ষুণি বলছি যে রুকু কাগজে কিসব লিখছে আমাকে দেখাচ্ছে না।
রুকুর চেহারা একটু নরম হলো মনে হচ্ছে।
-প্লিজ ভাইয়া,এখন যাও,কাল আমি তোমাকে সব বলবো।
সন্দেহ গভীর হলো।
-রুকু তোকে মানে আমি একটা কথা বলতে এসেছি,শোন হয়েছে কি,কাল জানিস কি? হাহাহা,বলতো কি?
-আব্বু আম্মুর এনিভার্সারি। আপু আমায় বলেছে, সেই কাজ ই করছি,যাও তোহ,তোমাকে আপু কেনো বলেছে,তুমি দিবে সব ভন্ডুল করে।

বলতে বলতে রুকু ঠেলতে লাগলো এক পর্যায়ে আমি খেয়াল করলাম আমি রুকুর দরজার সামনে। রুকু দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার,আপু আমাকে না করলো রুকুকে বলতে না কিছু,অথচ রুকুকে আবার আপু নিজেই বলেছে। রুকু টা কি পারতো না আমাকে সাথে নিয়ে কাজ করতে। ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছি,সামনে পড়লো আম্মু।
-তুই চুল কাটাস না কেনো?
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি,আজকের দিন ভালো যাচ্ছে না, আজ আমার মনে হচ্ছে প্রতি কদমে কদমে বিপদ, আম্মুর কথার জবাব যদি দিই তাহলে বেশি বিপদ,এক কথা থেকে দশ কথা হবে,সেই দশ কথার উত্তর দিতে গিয়ে কোন ফাঁকে এনিভার্সারির কথা বেরিয়ে যায়। আমি মুখ চেপে দাঁড়িয়ে রইলাম।
-কিরে উত্তর না দিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? দিন দিন একটা বেয়াদব হচ্ছিস,বেয়াদব ছোকরা দের সাথে মিশছিস,চুল কাটাচ্ছিস না,আমি বুঝিনা না এসব?
বলতে বলতেই একটা থাপ্পড় দিয়ে আম্মু উনার রুমে চলে গেলো গজগজ করতে।
কান্না পেয়ে গেলো,দেখলাম আনজুর মা তাকিয়ে আছে,উনাকে কাঁদছি এটা দেখতে দেওয়া যাবে না। নিজের ঘরে চলে এলাম। কাল এনিভার্সারি টা শেষ হোক বাসা থেকে পরদিন ভোর কিংবা পরদিন সন্ধ্যায় পালিয়ে যাবো। আমি একটা বইতে পড়েছি,উষা এবং গোধূলি গৃহত্যাগের লগ্ন। এই গৃহে আমাকে ভালোবাসার কেউ নেই,এই গৃহ ত্যাগ করতেই হবে। পালিয়ে চায়ের দোকানে চাকরি করবো। কাপ ভাঙ্গলে কি মার টাই আমাকে মারবে, আমার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো।
আশ্চর্য,মা আমায় থাপ্পড় দিলো,একটু দেখতে আসবে না আমাকে?

সন্ধ্যা হতে না হতেই আমার সব ক্ষোভ মিলিয়ে গেলো,গৃহত্যাগ নিয়ে পরেও ভাবা যাবে,আগে কালকের এনিভার্সারি নিয়ে ভাবা উচিত।
রাগ করে দুপুরে খাইনি,কেউ ডাক ও দিলো না। রুনাপুর অন্তত ডাক দেওয়া উচিত ছিলো,রুকুর কথা নাহয় বাদ দিলাম,আনজুর মা অবশ্যি একবার ডাক দিয়েছিলো, মেজাজ দেখিয়ে না করে দিয়েছি এখন প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়ে বসে আছে,ভাবলাম আনজুর মা চাপাচাপি করবে খাওয়ার জন্যে,করলেই তো রাজি হয়ে যেতাম।

রুনাপুর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম,
-ক্যাবলার মতোন দাঁড়িয়ে আছিস ক্যান,ভেতরে আয়।
আজ দিন অনেক খারাপ গিয়েছে,আপুর খাটের উপর বসে পা দোলাতে লাগলাম,আপুর ঘর টা কি সুন্দর করে সাজানো,দেয়ালে আপুর আঁকা পেইন্টিং গুলো, ইশ আপুর কত গুণ, এক কোণায় আপুর বেহালা টা আছে,আপু যা চমৎকার বেহালা বাজায়। আপু এক গ্লাস দুধ আর পাউরুটি এনে দিলো।
কথা না বাড়িয়ে খেতে শুরু করলাম। একবার না করে অনেক শিক্ষা হয়েছে,একদিনের জন্যে যথেষ্ঠ শিক্ষা।
-শুনলাম দুপুরে খাস নি?
-একবার তো সাধো নি,এখন জিজ্ঞেস করছো কেনো।
কপট অভিমান দেখালাম,এটুকু দেখানোই যায়,তারপরেও একটু বুক কাঁপলো,বলা যায়না আজকের দিন ভয়ানক খারাপ,এই কথা থেকেই ধমক খেতে পারি।
আপু ধমকালো না,একটু হাসলো।
রুকু কাগজ কেটে হ্যাপি এনিভার্সারি আব্বু আম্মু লিখেছে,ওটা দেখালো।
-তুমি আমাকে না করে রুকুকে সব বললে কেনো?
-আমি জানতাম তুই রুকুকে না বলে থাকতে পারবি না,প্রমাণ তো হলো?
দুধ টা খেতে পারছি না,পেট ব্যাথা করছে খুব।
-কি হলো? পুরোটা খা,শেষ কর।
-আপু ভালো লাগছে না,পেট ব্যাথা করছে।
-করুক, শেষ কর তুই।
একি ভয়ানক যন্ত্রণা,দিনের শেষে এই অপেক্ষা করছিলো?
এক টানে পুরো দুধ শেষ করলাম,এবং গা গুলাতে শুরু করলো, বমি করে আপুর ঘর ভাসিয়ে দিলাম।
আপুর ও একটা ভালো শিক্ষা হলো,এখন একটু ভালো লাগছে।
আপুর আজ কি হলো রাগছে না,আনজুর মাকে ডেকে ঘর পরিষ্কার করছে, একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে।
আপু আমার মুখ ধুইয়ে দিলো,জামা খুলে দিলো, ধরে ধরে রুম পর্যন্ত এনে দিয়ে বললো ঘুমিয়ে পড়তে। রাতে খাওয়ার সময় ডাকবে।

সে রাতে বাবা ফিরলো না…..

আমি বড় হওয়ার পর কখনোই বাবাকে রাতে বাড়ি না ফিরতে দেখিনি,ঠিক আছে,আমি হয়তো এতো বড় ও হইনি,কিন্ত বাবাকে আমি কখনো রাতে বাড়ি না ফিরতে দেখিনি। এক অজানা আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করতে লাগলো সকাল বেলা।
আমি আর আপু গেলাম সকালে কাগজের মিলে, গিয়ে শুনলাম বাবা সেখান থেকে গতোকাল দুপুরেই বের হয়ে গিয়েছিলেন।

সারাদিন আমি আর আপু এনিভার্সারির কেক নিয়ে বসে রইলাম। বাবা ওইদিন ও ফিরলেন না।
এই রাত টা ছিলো কেমন জানি ভয়ের, আমার ভয় হতে লাগলো,যদি বাবা আর কোনোদিন না ফিরে? কি হয়েছে বাবার? অজানা আতঙ্ক আমায় গ্রাস করে রাখলো,সেরাতে আমি আপুকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করেছিলাম।

বাবা একজন ডিভোর্সি মহিলাকে বিয়ে করেছেন। মালিবাগে উনার একটা ফ্ল্যাট ছিলো,সেখানেই থাকছেন। এসব ই জানানো হলো আপুকে,আপু শুনে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো,আম্মু কিছুই বললেন না। শুধু অবাক হয়ে আপুর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

আমাদের যাওয়ার বিকল্প কোনো জায়গা রইল না।

আমি দিশেহারা বোধ করলাম, স্কুল যাওয়া উচিত হবে কি হবেনা তা ভেবেই সারা দিন কাটালাম,রুকুটা ঘর থেকে বেরোয় না,ওর ঘরেও কাউকে যেতে দিচ্ছে না, খানিক পর পর বারান্দায় গিয়ে দেখছে আব্বু এসেছে কিনা।
আমার খুব ইচ্ছে করলো ওই মহিলা কে গিয়ে খুন করে আসি,আমাদের সহজ সরল বাবাকে কিরকম ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাদের থেকে নিয়ে চলে গেলো।

অনেক দিন বাবা ফিরলেন না। কিন্ত ম্যানেজার কাকুকে দিয়ে টাকা পাঠালেন। একদিন স্কুলের বাইরে দেখলাম বাবা দাঁড়িয়ে আছেন মাথা নিচু করে। আমায় দেখে হাসলেন। আমার কেনো জানি খুব ঘৃণা লেগে উঠলো। আমি দৌড়ে পালাতে চাচ্ছিলাম। কিন্ত আমার পা নড়ছিলো না,আমি বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বাবা আমার দিকে এগিয়ে আসছেন,আমি দৌড়ে বাসায় চলে এলাম। এসে খুব কাঁদলাম,মা আমাদের কারোর সাথেই কথা বলেন না। রুমাপু ইদানীং বাসায় থাকে না। রুকুটাও কথা বলেনা। আনজুর মা বিদেয় নিয়ে চলে গিয়েছে। বাসায় আমি এখন পুরোপুরি একা। কেউ আমায় এখন ধমক দেয়না, গাল টিপে দেয়না, অকারণে থাপ্পড় দেয় না।

আমরা একটা নতুন বাসায় উঠলাম,বাসাটা রুকুর স্কুলের কাছেই। রুমাপু চাকরি পেয়েছে,সে লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরি করে যাবে,একদিন আমায় বললো যে রাজু,তোকে অনেক বড় হতে হবে, তুই বড় হলেই আর চিন্তা নেই।আমরা কারোর দয়ায় বাঁচবো না রাজু।

আপুর মুখ টা শক্ত হয়ে রইলো।

এই আপু আমার অপরিচিত,বাবা বাসায় এসেছিলেন,আপু বাবাকে বাসায় ঢুকতে দেয় নি।

আপুর চোখের ঘৃণা টা আমিও আমার মনে উপলব্ধি করতে পারছি,শুধু রুকু টা দৌড়ে গেলো। বাবার জন্যে এত ভালোবাসা রুকু ধারণ করেছিলো কে জানতো।।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of

আরোও দেখুন

Close
Close