গল্প

কেবিন নং ৩৬৮

মাশকুরুল আলম

হসপিটালের কেবিনে তার সাথে দেখা। ধবধবে বিছানার চাদরে শুয়ে শুয়ে সে জীবনের অঙ্ক কষছে বোধহয়। কে জানে, হয়তো বা কোন অখ্যাত কবির কবিতাও আবৃত্তি করতে পারে আমার মত। আমার পাশের কেবিন বলে হাই হ্যালো করতে গেলাম।প্রতিত্তুরে ঠোঁটের কোণে ঈষৎ বাঁকা হাসি দিয়ে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার যেন চোখ নয়, এক গভীর সমুদ্র। তবে এ সমুদ্রে জোয়ার ভাটা নেই বোধহয়। মনে হয় জর্ডানের ডেড সি।কোন এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প এ সমুদ্রে গতিহীন লোনা জলের স্থায়ী বাসস্থান করে দিয়েছে।

হরিণের মত ডাগর চোখ বলতে যা বুঝায়। শক্তিশালী কেমোথেরাপী তার চুলগুলো খেয়েছে কিন্তু চোখের সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে মনে হয়।কেমোর আগে তার এই রুপে কতজনের রাতের ঘুম হারাম হয়েছে কে জানে।

আমি বসতে ভুলে গেছি।সে হাতের ইশারায় বসতে বলল। আমার চেতনা ফিরে এল। একজন অচেনা মেয়ের এভাবে চোখ দেখতে নেই। সমাজবিধি সব গেলাম ভুলে।

মেয়েটা মৃদু স্বরে বলল, “ভাইয়া, অবশেষে দেখা হল তবে। কিন্তু বড্ড অবেলা। সূর্য ডুবে যাচ্ছে দেখেছেন? আজ গোধূলি।হসপিটালের পাশেই এক বড় সবুজ মাঠ আছে। আমার বড্ড ইচ্ছে ওই মাঠে সবুজ স্কার্ট পড়ে দৌঁড়াব, পিছনে পরে থাকবে গোধূলির আকাশ। মৃদু বাতাসে আমার চুল উড়বে। কিন্তু চুলগুলো সব পরে গেছে। উড়তে পারছি না।”

প্রথম পরিচয়েই ভাইয়া সম্মোধন। আর গড়গড় করে বলে যাচ্ছে তার কথা গুলো। তার এসব শুনে আমার বুক ধক করে কেঁপে উঠল।এসব কথা যেন কোথায় শুনেছি।কে যেন বলত এমন করে।

কেমোর ইফেক্টের জন্য আমার মনে হয় ডিমেনসিয়া হয়ে গেছে। সব কিছু মনে করতে কষ্ট হয়। কে যেন এমনভাবে ভাইয়া বলে ডাকত, কে যেন এমন করে সবুজ মাঠ আর কাশবনে দৌঁড়াইতে চাইত।

আমি বললাম “কে আপনি, আমাকে কি চিনেন? কি নাম আপনার।”

এবার একটু কোমড় সোজা করে বসল। হেয়ালিপনার হাসি দিয়ে বলল “আপনি কি সব কেবিনেই এমন করে গিয়ে রুগীদের সাথে পরিচিত হোন।এতটা এক্সট্রোভার্ট হলেন কিভাবে।আপনি তো এমন ছিলেন না।”

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। এই মেয়েটা কি আমাকে বিস্মিত করার চেষ্টা করছে? আমাকে হিপনোটাইজ করতে চাইছে? বুদ্ধিমান লোকেরা চায় তার আশে পাশের সবাই তাকে দেখে বিস্মিত হোক।সে খুব বুদ্ধিমতী! এটা এভাবে প্রমাণ করার তো দরকার নাই।

“না, আসলে তা না। আমার পাশের কেবিনে একজন বাংলাদেশি আছে শুনে চলে এলাম। এই বিদেশে সবখানে হিন্দি আর ইংলিশ শুনে শুনে ক্লান্ত। তাই বাংলা কথা বলার লোভ সামলাতে না পেরে আপনার কেবিনে চলে এলাম। সে যাই হোক। আপনার নামটা কি জানতে পারি?” বিষ্ময় কাটিয়ে আমি শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করলাম।

পরিচয় পর্বটা এড়িয়ে গিয়ে সে বলল, ” আমি AML( Acute myeloblastic leukaemia) মনে পড়ে আপনার? আপনাকে আমি খুব চিনি। কতবার বলেছি, একবার এলেন না তো।”

আমার মস্তিষ্ক খেলছে না। কিছুই মনে করতে পারছি না। কিসের AML, কে মেয়ে। মনে হয় ব্রেনে মেটাস্টেসিস হয়ে মাথাটা গেছে। ধুর। সময় নষ্ট করছি। তার এটিন্ডেন্স বাহিরে গেছে। থাকলে কথা বলা যেত। এই মেয়েটার সাথে কথা বলে মাথা খারাপ করার মানে হয় না। তাকে এড়িয়ে যাবার জন্য আমি ফিবোনাক্কি নাম্বার মিলাতে শুরু করলাম।
১+২ মিলে ৩, ৩+২ মিলে ৫, ৫+৩ মিলে ৮ ডট ডট ডট। চলছে। এর মধ্যে মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি তার কেবিন ছেড়ে বেড়িয়ে এলাম।

সে রাতে মাথায় কিসব এলোমেলো চিন্তা ভর করল। আমি গভীর স্বপ্নে ডুবে গেলাম। একটা বিস্তৃর্ণ সবুজ মাঠ, আকাশে তখন গোধুলি,গোধুলির আকাশকে পিছনে ফেলে এক সবুজ স্কার্ট পড়া মেয়ে দৌঁড়ে আসছে। এলোমেলো বাতাস তার চুলগুলো উড়াচ্ছে।মেয়েটি দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে কাশবনের দিকে গেল। কাশবনের পরেই এক নীল জলের নদী। স্বপ্নেই আমার মনে হল এই মেয়েটা নীল জলে ঝাঁপ দিবে এরপর ডুবে যাবে। হ্যাঁ, মেয়েটা ডুবে যাচ্ছে। বাঁচার জন্য চেষ্টা করছে না। ঢেউহীন নদীতে সে সুন্দরকরে ডুবে যাচ্ছে। দৃশ্যটা আমার খুব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে উত্তপ্ত পৃথিবী থেকে বাঁচার আশায় সে শান্ত শীতল জলে প্রশান্তির আশায় সলিল সমাধিত হতে চায়। তার পুরো শরীর এবার ভেসে উঠল। নীল জলে নীল স্কাট পড়া একজন মেয়ে ভাসছে। শিল্পীর তুলিতে এ দৃশ্য খুব সুন্দর ফুটে উঠবে।

মেয়েটার নাম এতক্ষণে মনে পড়েছে। ওর নাম…হৃদ…. কিন্তু মনে পড়ছেনা। কেন? এই শোনো…. বলে ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে উঠলাম।

আমার চিৎকারে ৩৬৯ নাম্বার কেবিনের নার্স ছুটে এল। আমি বললাম,” সিস্টার, ৩৬৮ নাম্বার কেবিনের রুগীর অবস্থা কি?”
সিস্টার যা বলল তা আমার কানে তেমন কিছু ঢুকছিল না।মাথা ঘুড়ছিল।দুনিয়াটা উলটে যাচ্ছিল।

” তার ডায়াগনোসিস AML with blast crisis. গতরাতে কার্ডিয়াক এরেস্ট হলে আইসিইউতে শিফট করা হয়।দু দিনবার সিপিয়ার দিয়ে ব্যাক করলেও এক ঘন্টা পর মারা যায়। মরার আগে একটা অস্পষ্ট কথা বলতে থাকে।”

“আমাকে নাও হে নদী, হে শীতল জল। আমাকে নাও”

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of

আরোও দেখুন

Close
Close