গল্প

এখানে ভীষণ রোদ

ওয়ালিদ প্রত্যয়

এক।
মনসুর রহমান জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারে বসে আছেন। তিনি খুবই বিব্রতবোধ করছেন। যদিও বিব্রতবোধ করার কোনো কারণ নেই, এই জায়গায় তিনি এর আগেও অনেকবার এসেছেন। যতবারই এসেছেন, এই একই চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে বিব্রত হয়ে থেকেছেন।
মনসুর রহমান বসে আছেন একটা বড়ো চালের দোকানে। দোকানের মালিক তাজউদ্দীন সাহেব মনসুর রহমানের কাছের মানুষ। তাজউদ্দীন সাহেব বিত্তবান, তার দোকান এই শহরের সবচেয়ে বড় চালের দোকান। সফল ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় তার সন্মান আছে। সবাই তাকে মান্য করে। এমন একজন মানুষের সাথে সখ্যতা রাখতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার। মনসুর রহমান নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন।
তাজউদ্দীনের দোকানটা অনেকটা অফিসের মত। তাজউদ্দীন একটা আলাদা রুমে বসে, রুমে এসি আছে, চারদিকে কাঁচের দেয়াল। তার সাথে দেখা করতে আসা ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা রুম করা হয়েছে।
মনসুর রহমান এই রুমেই বসে আছেন। তার এখানে আসার প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেছে। এখন সকাল এগারোটা বাজে। দোকানের এক কর্মচারী একটু আগে এসে বলল, ভাইজান কি মহাজনের কাছে আইছেন?
মনসুর “হ্যাঁ” সূচক মাথা নাড়লেন। কর্মচারী বলল, তাইলে আপনেরে আরো ওয়েট করতে হবে। মহাজন একটু কাজে ব্যস্ত। বিক্রমপুরে ট্রাকে পঞ্চাশ বস্তা চাল পাঠানো হইছে। এখন হিসাব মিলতেছে না। গুইনা দেখা গেছে দুই বস্তা মিছিং। মহাজন হিসাব মিলাইতেছেন।
মনসুর বললেন, সমস্যা নাই। আমি বসে আছি। তোমার মহাজনের কাজ শেষ হলে আমাকে ডাক দিও।
মনসুর রহমানের ডাক পড়লো আরো ঘন্টা খানেক পর। তিনি আস্তে আস্তে তাজউদ্দীনের রুমে ঢুকলেন। তাজউদ্দীন মাথা নীচু করে কাগজে কিছু লিখছেন। রুমে এসি চালানো, কড়া পানের জর্দার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
তাজউদ্দীন মাথা তুলে বললেন, মনসুর সাহেব, বসেন বসেন। কখন আসছেন?
মনসুর রহমান চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, বেশিক্ষণ হয় নাই। আপনি ভালো আছেন?
ভালো আর থাকা যায় রে ভাই, তাজউদ্দীন বললেন, কিছু গর্দভ নিয়া ব্যবসা করি বুঝলেন। গর্দভগুলা হিসাব মিলাইতে পারে না, টেনশনে ফালায়া দেয়। পান খাইবেন? আমার ইদানিং পানের নেশা হইছে। পান না খাইলে অস্থির লাগে।
মনসুর বললেন, পান খাবো না। আমার পানের নেশা নাই।
না থাকাই ভালো, প্রচন্ড বদঅভ্যাস।
তাজউদ্দীন কাগজ খুলে পান মুখে দিলেন। আঙুলের মাথায় চুন নিয়ে জিহ্বায় লাগাতে লাগাতে বললেন, তারপর মনসুর ভাই আপনার খবর বলেন! পরিবার ভালো আছে?
জ্বী ভালো আছে। ভাই, আপনার কাছে একটা প্রয়োজনে আসছি।
তাজউদ্দীন বললেন, আমি জানি আপনি প্রয়োজনে আসছেন। কি প্রয়োজনে আসছেন সেটাও আমি জানি। আপনার টাকার প্রয়োজন , ঠিক বলেছি?
মনসুর মাথা নীচু করে বললেন, হ্যাঁ ঠিক বলছেন ভাইসাব। প্রচুর অর্থকষ্টে আছি। জানেন তো ছেলেটা ভার্সিটিতে পড়ে। তারে টাকা পাঠাইতে হয়। আমি কুলাইতে পারতেছি না।
তাজউদ্দীন বললেন, আপনার ছেলে তো সরকারি ভার্সিটিতে পড়ে। তার এত টাকার দরকার পড়ে কেনো? আমি তো জানি সরকারিতে পড়লে টাকা পয়সা লাগে না।
মনসুর হাস্যমুখে বললেন, আপনেরে বলছিলাম না ভাইসাব, আমার ছেলে আর্কিটেকচারে পড়ে । কাগজ টাগজ দিয়া তিন চার তালা বিন্ডিং বানায়। এসবে প্রচুর খরচপাতি। সেদিন তারে একটা কলম কিনা দেয়া লাগলো। কলমের দাম সাত’শ টাকা। এইটা দিয়া নাকি ছবি আঁকে।
তাজউদ্দীন বললেন, ভালো কথা, ছেলে তো তাইলে ইঞ্জিনিয়ার হয়া যাবে। কিন্তু কথা হইতেছে , যে জিনিসটা আপনি সামাল দিতে পারবেন না সেটা নিয়া ছেলেরে পড়ানোর কি দরকার? আমি আর কতদিন আপনারে টাকা ধার দিবো। আপনিই বলেন, আমি আপনার কাছে এখন পর্যন্ত কত টাকা পাই? ধার নিয়া তো শোধ দেন না।
মনসুর মাথা নীচু করে রইলেন। নেওয়াজ দুই বছর হলো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে তাকে অনেক টাকা দিতে হয়েছে। দুই দিন পর পরেই তার এটা ওটা দরকার হয়। ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি করানো বিরাট ভুল হয়েছে। তবে ছেলের মাথা ভালো ছিলো, স্কুলে বরাবর প্রথম।
তাজউদ্দীন বললেন, মাথা নীচু কইরা লাভ নাই ভাইসাহেব। বাস্তবতা মাইনা নিতে হবে। আপনার ব্যবসাপাতির কি অবস্থা? লাইব্রেরি ঠিক মত চলে না? দোকানে মাল উঠান না কেন?
মনসুর বললেন, লাইব্রেরি চলে কোনো রকমে ভাইসাব। বুঝেন তো অবস্থা, এখন অনেক লাইব্রেরি হইছে আশেপাশে। এজন্য ব্যবসা কম।
এলাকার হাইস্কুলের সামনে মনসুরের একটা লাইব্রেরি আছে। খাতা কলম স্কুলের বই পাওয়া যায়। লাইব্রেরির নাম “আলেয়া গ্রন্থাগার”। আলেয়া তার স্ত্রী’র নাম।
তাজউদ্দীন বললেন, দোকানে মাল উঠান। লাইব্রেরীটারে সচল করেন। ব্যবসা সহজ জিনিস না। হাওয়া বুইঝা পাল তুলা লাগে। বোকা মানুষ দিয়া ব্যবসা হয় না, বুঝলেন?
মনসুর বাধ্য ছেলের মত বললেন, জ্বী বুঝছি।
আপনার কত টাকা লাগবে?
মনসুর কাঁচুমাচু করে বললেন, হাজার তিনেক হইলেই হবে। পুরাটা একেবারে শোধ দিয়া দিবো ভাইসাব।
তাজউদ্দীন তার টেবিলের ড্রয়ার চাবি দিয়ে খুলতে খুলতে বললেন, শোধ দেওয়ার কথা তো বলেন খালি। কেমনে শোধ দিবেন? আপনার কাছে কত টাকা পাবো?
মনসুর বললেন, এইবারের তিন হাজার মিলা নয় হাজার সাত’শ টাকা হইছে। ব্যবসাটা একটু ভালো হইলেই টাকা ফিরত দিবো ভাই। নাইলে নেওয়াজের মা’র একটা কানের দুল আছে। সেইটা বেচবো। ভালো দাম আছে ওইটার।
তাজউউদীন ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে মনসুরের হাতে দিয়ে বললেন, তিন হাজার তিন’শ দিলাম। একেবারে দশ হাজার পুরা ফিরত দিবেন। আর ছেলে এলাকায় আসলে আমার কাছে আসতে বলবেন, তার সাথে কথা বার্তা বলবো। মেধাবী মানুষের সাথে কথা বলায় আরাম আছে। সারাদিন চলাফেরা করি গরু গর্দভের সাথে।
মনসুর মাথা নীচু করেই টাকা নিলেন। যেন অতি অপরাধের কোনো কাজ করেছেন। অবশ্য এটাকে খানিকটা অপরাধ বলাই যায়। তিনি জানেন টাকাটা ফেরত দিতে পারবেন না। লাইব্রেরী থেকে যে টাকাটা আসে সেটা দিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে চলার মত সংসার চলে, শখ করে দশ টাকার বাদাম কিনে খাওয়া যায়, দশ হাজার টাকা শোধ করা যায় না।
মনসুর বললেন, ভাইসাব আজকে উঠি। দোকান একলা ফালায়া আসছি। কেউ নাই।
আচ্ছা ঠিক আছে যান। দোকানে মন দেন। সিগ্রেট খান নাকি? খাইলে নেন।
তাজউদ্দীন সিগারেটের প্যাকেট মনসুরের দিকে ধরলেন। মনসুর লজ্জার একটা হাসি দিয়ে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নিলেন।
আচ্ছা আসি তাইলে ভাইসাব। ভাবিরে আমার সালাম দিয়েন।
মনসুর ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন আরেকটা পান মুখে দিয়ে সিগারেট ধরালেন।

মনসুর বের হয়ে দেখলেন, বাহিরে প্রচন্ড রোদ। চোখ মেলে তাকানো যাচ্ছে না। এতক্ষণ এসির মধ্যে থাকার কারণে বাহিরের তাপমাত্রা আঁচ করা যায় নি।
একটা ঠান্ডা পানীয় খেতে ইচ্ছে করছে। তাজউদ্দীন তিন’শ টাকা বাড়তি দিয়েছেন। সেখান থেকে কিছু টাকা খরচ করাই যায়। মনসুর একটা ঠান্ডা পানীয় কিনলেন, আলেয়ার জন্য কেক কিনলেন, সকালের নাস্তার জন্য টোস্ট বিস্কুট কিনলেন, কমদামী সিগারেটের প্যাকেট কিনলেন।
দুপুরে খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। লাইব্রেরী বন্ধ করে বাড়িতে যাওয়া উচিৎ। গোসল করে খেয়েদেয়ে ঘুম। আলেয়া প্রায় তাকে ‘বুড়ো হয়ে গেছো’ বলে টিটকারি করে। তার মনে হচ্ছে কথাটা একেবারে মিথ্যা না। ইদানিং দুপুরে খাওয়ার পর আর শরীর চলতে চায় না। প্রচন্ড অবসাদগ্রস্থ লাগে।
ঘন্টা দুয়েক ঘুমানোর পর লাইব্রেরীতে যান। রাত দশটার মধ্যে দোকান বন্ধ করে দেন। তারপর বাড়িতে এসে আর রাতে ঘুম হয় না। এটাও নাকি বুড়ো হয়ে যাবার লক্ষণ। রাতে ঘুম চলে যাবে। শেষ রাতের দিকে ঝিমুনী আসবে।
ঘুম না এলে মনসুর বারান্দায় বসে সিগারেট খান, আলেয়া ঘুমোন। একেকটা রাত অসম্ভব দীর্ঘ মনে হয়।

দুই।

মিতু’র জ্বর, গতকাল থেকে বিছানায় পড়া। বিকালে জ্বর মেপেছে, এক’শ দুই। এখন রাত দশটার মত বাজে। জ্বর কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
মিতু বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। গায়ে পাতলা কাঁথা, পাশে অরুন্ধতী রায়ের লিখা বই “দি গড অব স্মল থিংস” । দু’এক পৃষ্ঠা পড়ে আর পড়তে ইচ্ছা করছে না।
মিতুর ফোন বেজে উঠলো। ফোনে কথা বলতেও ইচ্ছা হচ্ছে না। সে অতি অনিচ্ছায় ফোন তুলল।
হ্যালো।
হ্যালো মিতু, কেমন আছো এখন? জ্বর কমেনি?
নেওয়াজ ফোন দিয়েছে। ছেলেটা ঘন্টা খানেক আগেও ফোন দিয়েছিলো। মিতু বলেছে আজকে যেন আর ফোন না দেয়। তবুও দিয়েছে।
হ্যালো হ্যালো মিতু কথা বলছো না কেনো? হ্যালো?
এত হ্যালো হ্যালো করো না। আমি ঠিক আছি। জ্বর সেরে গেছে। এখন একদম সুস্থ। একটু পর ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম বের করে খাবো।
নেওয়াজ বলল, তোমার কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছে না যে তুমি সুস্থ। তুমি কি আমার সাথে মিথ্যা কথা বলছো?
হ্যাঁ মিথ্যা বলছি। আধা ঘন্টা আগেই তোমাকে জানালাম যে আমার জ্বর কমেনি বরং বেড়েছে। অথচ তুমি আবার ফোন দিয়ে বিরক্ত করছো।
সরি। আর বিরক্ত করবো না।
মিতু চুপ করে রইলো। ছেলেটা এত নম্রভাবে কথা বলে, মায়া ধরে যায়। মিতু বলল, সরি বলতে হবে না, মাফ করে দিয়েছি। এখন রাখি। মাথা ধরেছে। আর ফোন দিও না।
মিতু ফোন রেখে দিলো। সে জানে, নেওয়াজ আবার ফোন দিবে। ছেলেটার সাথে “রাগ-রাগ” খেলতে তার ভালো লাগে।

নেওয়াজ ফোন রেখে সিগারেট ধরালো। মিতুর সাথে পরিচয়ে এই সিগারেটের একটা সম্পর্ক আছে। তখন নতুন নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া। একটা “বড় হয়ে গেছি” টাইপের ভাব চলে এসেছে। ছেলেরা এই “বড় হয়ে গেছি” ভাবটাকে পাকাপোক্ত করার জন্য সিগারেট ধরে।
ভার্সিটির ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই ঠিক করা হলো কোনো একটা পুকুর পাড়ে গিয়ে সবাই বসবে। সেখানে গিয়ে সবাই সবার সাথে পরিচিত হবে। সব ক্লাসের ছেলেমেয়েরা তো ক্লাসেই পরিচয় পর্ব সারে। তাদেরটা একটু ভিন্ন করার জন্যই এই প্লান।
পুকুর পাড়ে সবাই যে যার মত বসেছে। নেওয়াজ বসেছে একা একা । নতুন পরিবেশে সে অস্বস্তিবোধ করে। ঠিক মত কথা বলতে পারে না।
একটা মেয়ে নেওয়াজের কাছে এসে বলল, তুই দূরে বসছিস কেনো? ভয় লাগতেছে নাকি?
নেওয়াজ হাসির ভান করে বলল, না না, ভয় লাগবে কেনো? আমি ঠিক আছি।
ও আচ্ছা ভালো। যাই হোক , আমার নাম মিতু। এডমিশন টেস্ট থার্ড হয়েছিলাম।
নেওয়াজ এবার সত্যিকারের হাসি দিয়ে বলল, কনগ্রাচুলেশন। আমি নেওয়াজ। আমি ওয়েটিং লিস্ট থেকে চান্স পেয়েছি। কানের পাশ দিয়ে গুলি গেছে।
মিতু ফিক করে হেসে দিলো। নেওয়াজ আড়চোখে তার হাসি দেখলো। বাহ্‌! মেয়েটার হাসি তো সুন্দর।
মিতু বলল, আজকে সকালে চা’য়ের দোকানে তোকে সিগারেট খেতে দেখেছি। পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর করে সিগারেট কে খায় জানিস?
জানি না।
টম ক্রুজ। হলিউডের নায়ক। তার সিগারেট খাওয়া দেখে মেয়েরা ধুপধাপ প্রেমে পড়ে। তোর সিগারেট খাওইয়া অনেকটা তার মত। আমার ভালো লাগছে। ভালো লাগছে মানে এই নে যে আমি তোর প্রেমে পড়ে গেছি। বাঙ্গালী মেয়েরা সহজে প্রেমে পড়ে না।
নেওয়াজ বলল, আমি এমন কিছুই মনে করি নি।
মনে না করলে ভালো। তোকে দেখে অবশ্য বোকা বোকা লাগতেছে। আমি কিন্তু খুব চঞ্চল টাইপের। দেখবি সারা ক্লাস কেমন মাতিয়ে রাখি।

পরদিন মধ্যরাতে মিতু নেওয়াজকে ফোন দিয়ে বলল, শোন তুই আর সিগারেট খাবি না। একটা সিগারেট খেলে নাকি এগারো মিনিট আয়ু কমে, ফেসবুকে পড়লাম।
নেওয়াজ ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল, আমার আয়ু কমলে তোর কি?
মিতু বলল, আমার অনেক কিছু। বলেই ফট করে ফোন রেখে দিলো।
কিছু দিন পর ক্লাসে মিতু নেওয়াজকে এসে বলল, শোন, আজকে থেকে আমাকে আর “তুই” করে বলবি না। “তুমি” করে বলবি। তুই করে বললে কেমন যেন বন্ধু বন্ধু লাগে। এখন আমাকে বল, মিতু তুমি কেমন আছো?
নেওয়াজ অবাক হয়ে বলল, আমরা তো বন্ধুই। তুমি করে বলব কেন?
মিতু ভ্রুঁ কুঁচকে বলল, না আমরা বন্ধু না। তোকে যেটা বলতে বলছি সেটা বল।
নেওয়াজ বলল, মিতু তুমি কেমন আছো?
মিতু বলল, আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
বলেই মিতু উত্তরের আশা না করে দ্রুত উঠে চলে গেলো।

নেওয়াজ রুম অন্ধকার করে রেখেছে। রুম অন্ধকার করে ইয়ারফোনে গান শুনতে তার ভালো লাগে। অঞ্জন দত্তের “ক্যালসিয়াম” নামে একটা আছে। গানটা নেওয়াজের মনে ধরেছে। দিনে অন্তত বিশ বার এই গান শোনা হচ্ছে। দুদিন পর অবশ্য গানটা আর ভালো লাগবে না।
নেওয়াজের ফোন বেজে উঠলো। বাবা কল দিয়েছে।
বাবা কেমন আছো?
মনসুর খুক খুক করে কেঁশে বললেন, ভালোই আছি। হঠাৎ টনসিলটা ফুলছে। আজকে একটা ঠান্ডা জুস খাইছি। এইজন্যই মনে হয়। তোর কি খবর? ভালো আছিস ব্যাটা?
ভালো আছি।
তোকে তিন হাজার টাকা পাঠাইছি। পাইছিস?
হু, পেয়েছি।
ভালো মত পড়। টাকা নিয়ে টেনশন করিস না।
নেওয়াজ বলল, আচ্ছা টেনশন করবো না।
রাতের ভাত খাইছিস? ঠিক মত খাবি। শরীরে তো হাড্ডি ছাড়া কিছু নাই।
আচ্ছা ঠিক আছে। মা কি করে?
মনসুর বললেন, তোর মা কাঁথা সেলাই করতেছে। তারে রাতে কাঁথা সেলাইতে নিষেধ করছি, আমার কথা শোনে না। চোখগুলা নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ছাড়বে না। আচ্ছা এখন রাখি। ভালো মত থাকিস ব্যাটা।

মনসুর ফোন কেটে দিলেন। তিনি বারান্দায় বসে আছেন। বারান্দার এই জায়গাটা তার পছন্দের। টবে একটা ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। তিনি প্রতিদিন সকালে গাছে পানি দেন। গাছে হলুদ রঙের ফুল ফোটে। কিন্তু ফুলের নাম তিনি জানেন না। আলেয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আলেয়াও জানে না। আলেয়া বলেছে, কই থেকে আনো এইসব জংলা ফুল?
আজকের আবহাওয়া একদম গুমোট ধরে আছে। বাতাসের ছিটা ফোঁটা নেই। বৃষ্টি আসতে পারে। বৃষ্টি আসার আগে পরিবেশ থমথমে থাকে। তারপর হঠাৎ দমকা হাওয়া, তারপর বৃষ্টি।
আলেয়া পাশে এসে দাঁড়ালেন। মনসুর বললেন, এক কাপ চা খাবো। চা বানাও।
আলেয়া বললেন, চা খাইতে হবে না। এমনিতেই রাতে ঘুমাও না। চা খাওয়া বন্ধ।
একটু পর বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি দেখতে দেখতে চা খাবো।
আলেয়া বললেন, জ্যোতিষীগিরি বাদ দিয়ে ঘুমাইতে চলো। রাত অনেক হইছে।
আচ্ছা চা খাবো না। তুমি ঘর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে আসে আমার পাশে বসো। গল্পগুজব করি।
আলেয়া চেয়ার আনলেন। মনসুর বললেন, টাকা পয়সা নিয়া চিন্তায় আছি। তাজউদ্দীনের কাছে আর কত টাকা নিবো! লজ্জাও তো লাগে।
আলেয়া কিছু বললেন না। মনসুর বলে চলেছেন, ব্যবসা ভালো যাইতেছে না। বিক্রি বাটা নাই। নতুন মাল তুলার মতো টাকাও নাই। বাড়িটা ব্যাংকে বন্ধক রাখে যে লোন আনছি, সেটাও শোধ দিতে পারতেছি না। চিন্তায় অস্থির লাগে।
আলেয়া বললেন, চিন্তা করে কি হবে? কোনো একটা ব্যবস্থা হবে। আল্লা’র নাম নাও।
তোমার কথা মতো ছেলেটাকে এই সাব্জেক্টে ভর্তি করায় বিপদে পড়ছি। পানির মত টাকা যাইতেছে। ছেলেকেও কিছু বলতে পারি না। শুনেছি, ওরে একটা কম্পিউটার কিনে দিতে হবে। ওদের কাজ কারবার সব কম্পিউটারে। হাতে একটা টাকা নাই।
আলেয়া বললেন, তোমাকে না চিন্তা করতে নিষেধ করলাম। বেশি অসুবিধা হইলে আমার কানের দুলটা বিক্রি করে দাও। ১২ আনার মত সোনা আছে, এখন ভালো দাম পাওয়া যাবে।
মনসুর চুপ করে রইলেন। কানের দুল বিক্রির প্রসঙ্গ আসলেই তিনি চুপ করে থাকেন। আলেয়া আবারো বললেন, কাল পরশু দুল জোড়া সোনার দোকানে নিয়ে যাইও। দেখো কেমন দাম পাওয়া যায়।
মনসুর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলো ঘুমাইতে যাই।

তারা বিছানায় যাওয়া কিছুক্ষণ পরেই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। মনসুর ঘুমোতে পারলেন না। সারারাত জেগে বৃষ্টি ঝমঝম শব্দ শুনলেন।

তিন।
নেওয়াজ মিতুর দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছে। চোখের নীচে কালি পড়েছে। তবে কালিটা কেন যেন মিতুকে মানিয়ে গেছে। মেয়েটাকে সব কিছুতেই মানায়।
মিতু বলল, বলো তো আমার বয়েস কত?
নেওয়াজ হকচকিয়ে বলল, কত আর হবে? উনিশ-বিশ?
মিতু হিহি করে হেঁসে বলল, উহু, তবে আমি তোমার চেয়ে এক বছরের বড়, জানো? এতে তোমার অসুবিধা হবে না তো?
নেওয়াজ বলল, না, কোনো অসুবিধা হবে না।
মিতু বলল, আজকে সকালে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি অবাক। নিজেকে দেখে ভয় পেয়ে গেছিলাম। মনে হচ্ছিলো হঠাৎ করে আমার বয়েস বেড়ে ষাট হয়ে গেছে। দেখো না, চোখের নীচে কালি টালি পড়ে কি অবস্থা!
জ্বর থেকে উঠেছো মাত্র, দু’দিন পর ঠিক হয়ে যাবে।
মিতু বলল, হুম, এখন আমাকে রোমান্টিক কিছু বলো। অনেক দিন পর দেখা হলো। রোমান্টিক কথা শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে।
নেওয়াজ চুপ করে রইলো। মাঝে মাঝে এই মায়াবতীকে নিয়ে আর্মস্ট্রাডামে চলে যেতে ইচ্ছে হয়। সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে ওখানে একটা ছোট্ট কফি শপ দিবে। কফি শপের পাশে একটা ফুলের দোকান। বিকেলে এক কাপ ক্যাপাচিনো হাতে ফুলের দোকানে গিয়ে বসবে। কখনো কখনো মিতুকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া যায়। মেয়েটা আবার প্রচুর হলিউডের ছবি দেখে। এসব করতে করতে দুজন একসাথে বুড়ো-বুড়ি হয়ে যাবে।
নেওয়াজ এসব মনে মনেই ভাবে। কখনো মিতুকে বলা হয় না। নিম্ন মধ্যবিত্ত ছেলেদের এসব মনে মনেই রাখতে হয়, মুখে আনতে নেই।
মিতু বলল, চুপ করে থাকো কেন? আচ্ছা বাদ দাও। তোমার কি কোনো কারণে মন খারাপ? সেমিস্টার ফি দিয়েছো?
হ্যাঁ, বাবা টাকা পাঠিয়েছে। বাবার খুব টানাটানি অবস্থা। টাকার সঙ্কট। আমার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। মনে হয় পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাবার সাথে লাইব্রেরিতে গিয়ে বসি।
মিতু বলল, দূর বোকা, এই তো কয়েকটা দিন। তারপর তো তুমি আর্কিটেক্ট হয়ে যাবে। নিজের বাড়ি নিজেই ডিজাইন করে ফেলবে।
নেওয়াজ মুচকি হাসে। প্রতি রাতে পানির মত পাতলা ডাল দিয়ে ভাত খেতে খেতে ইদানিং বড় স্বপ্ন দেখা ভুলে গেছে। পেটে ক্ষুধা রেখে বোধয় বড় স্বপ্ন দেখা যায় না।
নেওয়াজ বলল, চলো উঠি। আমি মেসে যাবো। গোসল দিবো। গরম পড়েছে।
নেওয়াজ মিতুকে রিক্সায় উঠিয়ে দিলো। রিক্সা আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলে মিতু পেছন দিকে তাকিয়ে জোরে বলল, নেওয়াজ, আমি মিথ্যা বলেছি। আমি তোমার চেয়ে এক বছরের বড় না। টেনশন নেওয়ার কিছু নাই।
নেওয়াজ “হাহা” করে হেঁসে দিলো।

চার।
মনসুরের বয়স যখন একুশ, আলেয়ার সতেরো। আলেয়া ক্লাস টেনে পড়ে। স্কুল থেকে আলেয়ার বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে একটা বড় আম গাছ আছে। মনসুর প্রতিদিন আম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। আলেয়া স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার সময় দু’জনের চোখাচোখি হয়। আলেয়ার সাথে যে বান্ধবীরা থাকে , তারা এই চোখাচোখি দেখে হাসাহাসি করে।
মনসুর মাঝে মাঝে চিঠি লিখে। সাধু চলিত শুদ্ধ অশুদ্ধ মিশ্রিত গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠি।
আলেয়ার ছোটো ভাই রাসু তখন ক্লাস ফাইভের ছাত্র। রাসু ছিলো তাদের প্রেম পত্র বাহক। সে চুপিচুপি চিঠি আদান প্রদান করতো।
আলেয়ার বাড়ি থেকে সেই আম গাছ দেখা যায়। আলেয়া কিছুক্ষণ পর পর উঁকি মেরে দেখে মনসুরকে দেখা যায় কিনা। আলেয়া রাসুকে বলে, ভাই গাছ তলায় যা। উনি দাঁড়ায়া আছে, চিঠি দিবে মনে হয়। যা নিয়ে আয়। এই নে আট আনা।
রাসু বলল, আট আনায় হইব না। এক টাকা পুরা দেয়া লাগবে। ছোটকু’র দোকানে একটা লজেন্সের দামই তো আট আনা। রাসু একটা লজেন্সের জন্য কোনো কাম করে না।
আলেয়া গোমড়া মুখে ওড়নার গিট্টু খুলে আরো আট আনা বের করে রাসুর হাতে দিলো। রাসু আম গাছ তলায় মনসুরের হাত থেকে চিঠি নিয়ে বলল, এক টাকা দেন। মাগনা কাম করি না।
মনসুর শার্টের পকেট থেকে এক টাকা বের করে রাসু’র হাতে দিয়ে বলল, যাও, তোমার আপাকে চিঠিটা দিয়া আসো।

রাত হয়েছে, সবাই ঘুম। আলেয়া পাশে রাসু শুয়েছে। রাসুও ঘুমিয়ে পড়েছে বোধয়। আলেয়া কুপির আলোতে চিঠি পড়তে শুরু করলো।

প্রিয় আলেয়া বেগম,
চিঠি লেখায় বিলম্ব হওয়াতে আমি দুঃখ প্রকাশ করতেছি। বাবার জমি চাষের ব্যাপার সাহায্য করিতে গিয়া এই বিলম্ব হইয়াছে। নিজ গুণে ক্ষমা করিও।
তুমিও আমারে চিঠি লেখা কমাইয়া দিয়াছো। নিয়মিত চিঠি লিখিও। তোমার চিঠি না পাইলে অস্থির লাগে।
তুমি জানিয়া খুশি হবে, আমি যে কয়েকজন ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াই, সে প্রাইভেটের বেতন এবং বাবার কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা নিয়া আমি তোমার জন্য একটা উপহার কিনিয়াছি। আমি হতদরিদ্র ঘরের সন্তান। উপহারটা কিনিতে আমার বড় কষ্ট হইয়াছে। আশা করি তুমি উপহার ফিরাইয়া দিবে না। কেননা হইতে পারে এইটাই আমার তোমারে দেওয়া প্রথম এবং শেষ উপহার।
আগামীকাল সকাল দশটায় দিকে আমি মির্জাকান্দা ব্রিজের পাশে থাকিবো। তুমি স্কুলের ক্লাস বাদ দিয়ে আসিও।
ইতি
মনসুর রহমান
পুনশ্চঃ আলেয়া, তোমারে দেখতে ইচ্ছা করে।

আলেয়া চিঠি পড়ে কেন যেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। পাশ থেকে হঠাৎ রাসু বলে উঠলো, আপা কান্দন থামা। ঘুমাইতে পারতেছি না।

ব্রিজের পাশে আলেয়া মনসুর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। আলেয়া বলল, কি বলবা তাড়াতাড়ি বলো। কেউ দেখলে অবস্থা খারাপ।
মনসুর পকেট একটা একটা রুমাল বের করলো। দেখে মনে হচ্ছে, রুমাল দিয়ে কিছু একটা পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। মনসুর রুমাল খুলল। ভিতরে দুইটা সোনার কানের দুল। রোদ পড়ে চিকচিক করছে।
আলেয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে রাতের ঘুম এখনো ভাঙ্গে নি।
মনসুর কানের দুল আলেয়ার দিকে দিয়ে বলল, নাও। তোমার জন্য।
আলেয়া বলল, সোনার দুল কই পাইছো? এত টাকা কই পাইলা?
টাকা কই পাইছি এইটা তোমাকে চিঠিতে বলেছি। এক কথা কতবার বলবো? নাও হাতে নাও।
আলেয়া দুল হাতে নিলো। তার হাত কাঁপছে।
কানে পড়ো, দেখিব তোমারে কেমন লাগবে? আমি জানি দারুণ লাগবে ইনশাল্লাহ্‌ ।
এখন পড়বো না।
আচ্ছা, তোমার পছন্দ হইছে?
আলেয়া উত্তর না দিয়ে চোখের পানি মুছলো। তার আর স্কুলে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। বাড়িতে যেতেও ইচ্ছা হচ্ছে না। মনে হচ্ছে তার সামনে দাঁড়ানো আলাভোলা এই মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে বলতে, আমার এই দুল লাগবে না। চলো এটা বেচে দেই। যে টাকা পাবো সেটা দিয়ে বিয়ে করে সংসার শুরু করি।

আলেয়া প্রতিদিন একবার করে গোপনে দুল জোড়া পড়ে আয়নায় নিজেকে দেখে। অতিযত্নে রুমাল দিয়ে মোছে। তার নিজের একটা ট্র্বাঙ্ক আছে। সেখানে সে খুব সাবধানে দুল লুকিয়ে রাখে। তার প্রেম জীবনের প্রথম উপহার। মানুষটা কত কষ্ট করে কিনেছে। আহারে!

পাঁচ।
মনসুর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। তার হাতে সিগারেট। মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে। তবুও গরম কমছে না। মনসুর ঘামছেন, ঘামে তার শার্ট ভিজে গেছে।
আলেয়া ঘরে ঢুকে মনসুরের পাশে বসে বললেন, শার্টটা খুলে ফেলো। লেবুর শরবত আনে দেই?
মনসুর উত্তর দিলেন না। আলেয়া লেবুর শবরত আনতে চলে গেলেন। শরবত নিয়ে এসে দেখে মনসুর রকই ভাবে বসা। শার্ট খুলে নি।
আলেয়া শরবত রাখতে রাখতে বললেন, তুমি কি কিছু চিন্তা করতেছো? আমাকে বলো, স্ত্রীর সাথে সব কিছু ভাগাভাগি করতে হয়।
মনসুর সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, নেওয়াজ ফোন দিয়েছিলো। আগামী মাসের মধ্যে তার কিছু টাকা লাগবে। ছেলেকে কম্পিউটার কিনে দিতে হবে। তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং এর সব কাজ কম্পিউটারে। এখন কি করবো বুঝতেছি না।
আলেয়া বললেন, শরবতটা খান।
মনসুর শরবত হাতে নিলেন না। বললেন, ভাবতেছি দোকানটাও লোনে রাখবো। এছাড়া উপায় নাই।
আলেয়া বললেন, দোকান লোনে রাখার দরকার নাই। বাড়িটা তো লোনে আছেই, এটাই তো শোধ দেওয়া যাইতেছে না। তোমাকে না বললাম, আমার কানের দুল জোড়া বিক্রি করে দিতে। ভালো দাম পাওয়া যাবে।
মনসুর চোখ মুখ শক্ত করে বললেন, তোমাকে কতবার বলেছি যে কানের দুলটা বেচার কথা বলবা না। এটা আমার দেওয়া প্রথম উপহার । কি পরিমাণ কষ্ট করে আমি সেই আমলে তোমার জন্য এটা কিনেছিলাম, তোমার কোনো ধারণা আছে?
আলেয়া বললেন, আমার ধারণা আছে। কিন্তু সেই দুই নিশ্চয়ই আমার সন্তানের চেয়ে বড় না। আমাদের তো একটাই সন্তান।
মনসুর বললেন, দুল জোড়া আমার সন্তানের চেয়ে ছোটোও না। তুমি পরম যত্নে সেগুলিরে আগলায় রাখছো। এই জিনিস আমি বেচবো কিভাবে?
আলেয়া বললেন, আচ্ছা মাথা ঠান্ডা করেন। শরবতটা খান।
মনসুর শরবত হাতে নিয়ে বললেন, যাও দুল দুইটা পইরা আসো। দেখবো।
আলেয়া হাসতে হাসতে বললেন, বুড়া বয়েসে রঙ ঢঙ বাদ দাও।
রঙ ঢঙের কোনো বয়েস লাগে না। যাও পইরা আসো।

আলেয়া দুল পড়ে ঘরে এসে দেখে মনসুর ঘুমিয়ে পড়েছেন।

ছয়।
তাজউদ্দীন বললেন, কিছুদিন আগেই আপনেরে টাকা ধার দিছি মনসুর ভাই। এখন আর দিতে পারবো না। আমারও তো সংসার-সন্তান আছে। তাদের দেখভাল আমারেই করা লাগে।
মনসুর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ভাইসাব, এক গ্লাস পানি খাবো।
তাজউদ্দীন এক কর্মচারীকে ডেকে পানি দিয়ে যেতে বললেন। মনসুর পুরো গ্লাস পানি শেষ করে বললেন , তাজউদ্দীন ভাই, আমি আপনার টাকা ফেরত দিতে আসছি। আপনার কাছে টাকা ধার চাইতে আসি নাই।
মনসুর পকেট থেকে টাকা বের করলেন। গুনে গুনে দশ হাজার টাকা তাজউদ্দীনের হাতে দিয়ে বললেন, নেওয়াজের মাতা’র একটা শখের কানের দুল ছিলো। সেটা আজকে বিক্রি করলাম। মোটামুটি দাম পাইছি। ছেলের আবার কম্পিউটার লাগবে। তারে এইবার বাড়িতে আসলে একটা কম্পিউটার কিনে দিবো। ভাই উঠি?
তাজউদ্দীন নিঃশব্দে টাকাটা নিলেন। টাকা না গুনেই ড্রয়ারে রাখলেন। মনসুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ইদানিং প্রচন্ড গরম পড়ছে। ঠান্ডা কিছু খাবেন ভাই?
না , আমার আবার টনসিলের বাতিক। আমি উঠি। লাইব্রেরি এখনো খুলি নাই। বেলা হয়ে যাচ্ছে। আগে একটু বাড়িতে যাবো। আপনার ভাবির কাছে টাকা দিয়ে তারপর যাবো লাইব্রেরি খুলতে। আর কিছুদিন পর নেওয়াজ বাড়িতে আসবে ছুটিতে। আপনার সাথে দেখা করতে বলবো। গেলাম ভাই।

মনসুর বাড়িতে এসে দেখলেন আলেয়া রান্নাঘরে মাছ কুটছে। রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে বললেন, আলেয়া হাত ধুয়ে আসো। টাকাটা আলমারিতে রাখো।
আলেয়া উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে আসলেন। মনসুরের হাত থেকে টাকা নেওয়ার সময় খেয়াল করলেন মনসুরের হাত কাঁপছে। আলেয়া আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন মানুষটার চোখে পানি।
আলেয়া বললেন, তোমার কি হয়েছে? তুমি কানতেছো কেন? আসো ঘরে আসো তো। ফ্যানের নীচে বসো। আজকে দোকান খুলার দরকার নাই। দেখো দেখি অবস্থা, সামান্য দুলের জন্য বাচ্চা মানুষের মত কানতেছে।
আলেয়া মনসুরকে বিছানার বসালেন। ফ্যান ছেড়ে দিলেন। টাকাটা আলমারীতে রাখলেন। তারপর খুব দ্রুত গোসলখানায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে মুখে শাড়ির আঁচল চেপে ধরে কেঁদে দিলেন।

সাত।
নেওয়াজ বাড়িতে এসেছে। মিতু নেওয়াজের মা’য়ের জন্য একটা শাড়ি কিনে পাঠিয়েছে। নেওয়াজের হাতে শাড়ি দেওয়ার সময় মিতু বলল, শোনো, আন্টিকে বলবে শাড়িটা আমি দিয়েছি। আবার মিথ্যে করে বলে বসিও না যে এটা তুমিই কিনে আনছো। বুঝলা?

নেওয়াজ বাড়িতে এসেছে বিকেলে। বাবার সাথে দেখা হলো রাত দশটায়। মনসুর দোকান বন্ধ করে এসে ছেলেকে দেখলেন।
নেওয়াজ বলল, বাবা কেমন আছো? চোখ আরো গেছে নাকি? চশমার কাঁচটা বেশি মোটা মনে হচ্ছে!
মনসুর বললেন, আর চোখ! বাঁচে আছি এই বেশি। তোর কি খবর বল। চুল এত বড় রাখছিস কেনো? লোকে দেখলে খারাপ বলবে। কালকে সকালে টাকা নিয়ে যাস আমার কাছে, চুল কাটায়া আসবি।
নেওয়াজ বলল, বাবা ভার্সিটির ছেলেপুলেরা এমন একটু এধটু চুল বড় রাখেই এটা কোনো ব্যাপার না।

রাতে তিনজনে একসাথে খেতে বসলেন। ডালের চচ্চড়ি, ঢেড়স ভাজি, তেলাপিয়া মাছ। তেলাপিয়া মাছ নেওয়াজের পছন্দ। খেতে খেতে পিতা পুত্রের মধ্যে কথা হলো।
মনসুর বললেন, ভালো মত খা। তোর মত বয়েসে আমার ওজন ছিলো আশি কেজি। আর তুই? একটু বাতাস আসলেই তো উড়ে যাবি।
তিন জন একসাথে হেঁসে উঠলো। নেওয়াজ বলল, ঐ যে বলেছিলাম আমার একটা ফ্রেন্ড আছে , মিতু নাম । সেও একই কথা বলে। আমি নাকি ইদানিং শুকায় গেছি।
মনসুর আর আলেয়া চোখাচোখি করে মুচকি হাসলেন।

নেওয়াজ খাওয়া দাওয়া করে বিছানায় এসে শুয়েছে। নেওয়াজের ঘরটা ছিমছাম। নেওয়াজ প্রতিবার ঘর এলোমেলো করে রেখে যায়, ছুটিতে বাড়িতে এসে দেখে মা ঘর গুছিয়ে রেখেছে। পরিষ্কার বিছানার চাদর, টেবিলের বইগুলো পর্যন্ত পরিষ্কার করা।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে মিতুকে ফোন দিতে হয়, এটা একটা অলিখিত নিয়ম। নেওয়াজ নিয়ম রক্ষার্থে ফোন দিলো।
হ্যালো মিতু, খেয়েছো?
খেয়েছি। আন্টির শাড়ি পছন্দ হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে।
নেওয়াজ কথা বলতে বলতেই খুক খুক কাশি দিয়ে মনসুর ঘরে ঢুকে বললেন, ব্যাটা ঘুমায়া পড়ছিস নাকি?
নেওয়াজ বাবার কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে ফোন কেটে দিলো।
না বাবা, এসো। বসো এখানে।
মনসুর বিছানায় নেওয়াজের পাশে বসতে বসতে বললেন, তোর পড়াশোনা খবর নিতে আসলাম। কেমন চলতেছে?
ভালো। রেজাল্ট একটু খারাপ হয়েছে যদিও। তবে নেক্সটে ভালো করবো।
ও আচ্ছা। তোর কম্পিউটারের জন্য টাকা জোগাড় করছি। চল্লিশের মত জোগাড় হইছে। এতে হবে না?
হবে বাবা।
আচ্ছা ব্যাটা, তোরা যে বিল্ডিং এর ডিজাইন করিস সেগুলো নিজেই করিস নাকি কারোটা দেখে দেখে?
নেওয়াজ হাসতে হাসতে বলল, আমরা নিজেরাই করি বাবা। দেখে দেখে করলে তো মার্ক দিবে না। এই দেখো আমার কাছে আমার ডিজাইন করা কয়েকটা বাড়ির ডিজাইন আছে।
নেওয়াজ বাবাকে মোবাইল থেকে ছবি দেখালো। মনসুর বলল, বাহ্‌। শোন নেওয়াজ, তোর কাছে একটা কাজ নিয়া আসছি।
বলো বাবা।
তোরা এই যে বিল্ডিং এর মডেল বানাইলি, এটা কি দিয়া বানাস? কাগজ?
না বাবা, এটাকে প্লাস্টিক উড বলে। শক্ত কিন্তু ব্লেড দিয়ে কাটা যায়। যেমন খুশি তেমন ভাবে কেটে সুপার গ্লু দিয়ে জোড়া দিতে হয়।
হুম, এটা জানার জন্যই আসছি। আচ্ছা, তোর কাছে কি এই প্লাস্টিকটা আছে? গ্লু আছে?
নেওয়াজ অবাক হয়ে বলল, আমার ব্যাগে কিছু টুকরা থাকতে পারে। কেন বাবা? প্লাস্টিক উড দিয়ে তুমি কি করবে?
মনসুর নীচু স্বরে বললেন, আমাকে একটা জিনিস বানায় দিতে হবে।
কি জিনিস বাবা?
মনসুর বললেন, তুই পারবি কিনা বল।
পারবো। কিন্তু কি বানাবো?
মনসুর বললেন, তুই তোর ব্যাগ থেকে জিনিস পত্র বের কর। আমি বলতেছি।
নেওয়াজ প্লাস্টিক উডের একটা টুকরা, গ্লু, ব্লেড নিয়ে বাবার কাছে বসলো।

আট।
রাত প্রায় আড়াইটা।
আলেয়া ঘুমিয়ে পড়েছেন। মনসুর বিছানার পাশে এসে আলেয়াকে ডাক দিলেন, আলেয়া, উঠো। জরুরি কাজ আছে।
আলেয়া কোনো রকমে চোখ খুলে বললেন, কি হইছে? তুমিও ঘুমাও নি কেন? রাত কয়টা বাজে?
মনসুর বললেন, বাজুক । তুমি উঠো। চোখে পানি দিয়ে বারান্দায় আসো।
আলেয়া স্বামীর কর্মকান্ডে অবাক হয়ে গেলেন। বারান্দায় গিয়ে দেখেন মানুষটা রুমাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। রুমালের ভিতর কিছু একটা মোড়ানো।
মনসুর বললেন, নাও তোমার উপহার।
আলেয়া রুমাল খুলে দেখলেন ভিতরে সাদা রঙের কিছু একটা। তিনি অবাক হয়ে বললেন, এইটা কি?
এইটা দুল। যেটা দিয়ে বানানো সেইটার নাম প্লাস্টিক উড, সুপার গ্লু দিয়া জোড়া লাগাইছি। জিনিসপত্র নেওয়াজের কাছ থেকে নিছি। সুন্দর হইছে না?
আলেয়া নিষ্পলক ভাবে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মানুষটা বলে চলল, আলেয়া দেখিও, এই প্লাস্টিকের দুল জোড়া সোনার হয়ে যাবে। তোমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে এটাকে সোনা বানাবো।
আলেয়া দুল দুইটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। গলা ভেঙে কান্না আসছে। কথা বলা যাচ্ছে না।
মনসুর বললেন, যাও , একটু পইরা আসো, আমি দেখবো। আমি বারান্দায় আছি।
আলেয়া দুল নিয়ে আয়নার সামনে আসলেন। আলমারী থেকে বিয়ের শাড়িটা বের করে পড়লেন, চোখে গাঢ় করে কাজল দিলেন, চুল খোঁপা করলেন, ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক দিলেন। অতি যত্নে কানে প্লাস্টিকের দুল পড়লেন।

মনসুর আলেয়াকে দেখে বললেন, তোমাকে সুন্দর লাগতেছে। সাদা দুল দুইটা মানাইছে।
আলেয়া মনসুরকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আলেয়া মনসুরের বুক থেকে মাথা তুললেন না। এজন্য মনসুরের অশ্রুজল তার চোখে পড়লো না।
দু’জন মানুষের অশ্রুজলের সাক্ষী থাকলো শুধু হলুদ রঙের জংলা ফুলগুলো।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close