কাব্য আলোচনা

আবিদ আজাদ এক গায়ক পাখির নাম

মামুন মুস্তাফা

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে জনমানুষের সর্বব্যাপী জীবনের প্রতিটি স্তরে এক ধরনের আশাআকাঙ্খার আবেগ কাজ করেছিল। তখন বাঙালির জীবনে কবিতা এসে দাঁড়ালো একটি নতুন ভাষাভঙ্গি নিয়ে। পঞ্চাশ ও ষাটের কবিদের পাশাপাশি একটি নতুন প্রজন্ম, কিশোরোত্তীর্ণ বয়স যাঁদের, স্বাধীনতার আনন্দ যাঁদের চোখে তরবারির মত ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তাঁরাও এসে দাঁড়ালেন সামনে। এই নতুন কবিদলকে বলা হলো সত্তরের কবি। এই কবিদের সামনে মুক্ত ভূখণ্ডের বিশাল আকাশ যেমন আবেগকে উসকে দেয়, তেমনি এই কবিদের চোখের সামনেই ঘটে যেতে থাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক চারিত্র্যের মধ্যেই স্বপ্ন-সাধ-আশা-আকাঙ্খার বিশাল পরিবর্তন।

ফলে ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ, দীনতা, ক্ষোভ ও আত্মাভিমান চূর্ণবিচূর্ণ হলো। স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষের স্বপ্ন ও প্রাপ্তির এই ব্যবধান সেই সময়কে ঠেলে দিলো আবেগ আর উচ্ছ্বাসের দিকে। এমনই পটভূমিতে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশের সত্তরের দশকের কবিতা। হতাশা, বিকার, স্বপ্নভঙ্গ, অবাধ যৌনবৃত্তির মোহ, প্রযুক্তি ও প্রসাধন সত্তরের দশকের কাব্যবোধকে পরিণত করেছিল ব্যক্তির ভাগাড়ে। এসব চারিত্র্যকে বহন করেছেন সত্তরের দশকের কবিরা। এঁদেরই অন্যতম কবি আবিদ আজাদ সেই বিপন্ন, বিধ্বস্ত, শহর-গ্রাম-জনপদ এবং ব্যক্তিক কাঁটা ও কুসুমের বর্ণিল আখ্যান তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়।

এ পৃথিবী বর্ণিল গন্ধময়। সেই সুন্দরের কেনাবেচা করেন কবি নিজেরই চেতনার রঙে। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি, মহাকবি আলাওল তাঁর ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের শুরুতেই বলেছেন কাব্যকথা সুমধুর। কোন এক অনন্ত উৎসব হতে সুমধুর প্রতিধ্বনি এসে ভেসে ওঠে কবির চেতনার আর্শিতে। যে কবির সেই আর্শি যত দিগন্ত বি¯তৃত, তাঁর সৃষ্টিতে রয়েছে তত বিস্ময়, আনন্দ ও মুগ্ধতা, সেই আনন্দ ও মুগ্ধতা মানব হৃদয়ের চিরায়ত সৌন্দর্যরূপ হয়ে আছে কবির তৃতীয় নয়নে। আবিদ আজাদের কবিতায় তাঁর জীবন-চেতনার বহুমুখী রঙ ও মধুরতা ধরা পড়ে, যার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে কবিতায় গীতিময়তা। এই রোমান্টিক গীতমিয়তার ভিতরেই নগর জীবনের আধুনিক অনুষঙ্গ কবি আবিদ আজাদের কবিতার প্রধান সুর।

পরিবর্তনশীল সমাজকাঠামোর ভিতরেই সারাক্ষণ কবিতামগ্নতায় আচ্ছন্ন ঘোরলাগা এক কবির নাম আবিদ আজাদ। কবিতা রচনায় একেবারেই নির্ভেজাল ও সৎ। আবিদ আজাদ সত্তরের দশকের বিতৃষ্ণা ও অবক্ষয়ের মধ্যে বাস করে, এমনকি কৃত্রিম নাগরিক সংস্কৃতির মধ্যে অবস্থান করেও বাংলা কবিতার রোমান্টিক লোকজ জীবন দৃষ্টিকে গভীর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। নাগরিক নয় বরং শহরকেন্দ্রিক কবি হিশেবে আবিদ আজাদ বাংলা কবিতায় হারিয়ে যাওয়া স্বভাবজ গীতলতা ও সবুজের ঝংকার ফিরিয়ে এনেছিলেন। এটা তাঁর কোন আরোপিত উপলব্ধি নয়, যে মাটি থেকে উঠে এসেছেন তিনি, সেই মাটির গন্ধ ভেতর থেকে তাঁকে টেনে এনেছে লোকজ ভুবনে। ‘ঘাসের ঘটনা’ আবিদের প্রথম কাব্য প্রকাশের মুহূর্তেই পাঠক জেনে যান নাভিমূলে প্রোথিত এক গীতিকবির কথা। তবে চিত্রধর্মীতাই তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর চিত্র বাস্তবধর্মী ও কল্পনাশ্রয়ী।

১৯৭৬ সালে আবিদের প্রথম কবিতার বই ‘ঘাসের ঘটনা’ চিহ্নিত হয়ে আছে এক মাইলফলক হিশাবে। প্রথম কাব্যেই বিদগ্ধ পাঠক আবিষ্কার করেন টাটকা আর বিচিত্র সব চিত্রকল্পের ভিতরে ঘাসের ডগায় ভোরের শিশির, যেখানে সূর্যরশ্মি বর্ণিল বিভাস সৃষ্টি করে চলেছে। মনের মধ্যে এক নান্দনিক প্রজাপতি ডানা মেলে আর দূরে কোথাও ডেকে ওঠে শালিক-ডাহুক, কোন এক নাম না জানা ‘গায়কপাখি’:

স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল
সেই প্রথম আমি যখন আসি
অন্যমনস্কভাবে আমার এই পুনর্জন্ম দেখেছিল
তিনজন বিষণœ অর্জুন গাছ।
সেই থেকে আমার ভিতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছিÑ
মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে? (জন্মস্বর : ঘাসের ঘটনা)
‘ঘাসের ঘটনা’র কবিতাগুলো আদ্যোপান্ত আবেগশাসিত ও রোমান্টিক আতিশয্যে আক্রান্ত। তবে আবিদ আজাদের অধিকাংশ কবিতার উৎস স্মৃতি, তাঁর বাহন গল্পময়তা। আর স্মৃতিনির্ভর বলেই তাঁর কবিতাও হয়ে ওঠে নস্টালজিক। এই নস্টালজিয়ায় শহর ও গ্রাম মিশে আছে:

আজ মনে পড়ছে সেইসব মুঠোবন্দি জোনাক পোকার দুঃখ
হাওয়ার হাওরে ছইনৌকার মতো এক রত্তি পাখি
গলার নিচের দিকে অদ্ভুত নরম নীল রোঁয়া
উঠোনমনির মুখ, ভোরবেলাকার হিমভেজা কার চোখ
আগডুম বাগডুম চারিদিক, বাক দিচ্ছে সুন্দর মোরগ।
(দুঃখ : আমার মন কেমন করে)

কবিতায় গল্পকাঠামো নির্মাণ আবিদের অন্বিষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। গল্পের সমূহ উপাদানে তাঁর কোন কোন কবিতা হয়ে ওঠে গল্প-কবিতা। আবিদ আজাদের কবিতায় শৈশবের স্মৃতিকাতরতা এবং ঐতিহ্যের অনুসন্ধান রূপ পায় নতুন ব্যঞ্জনায়। যাত্রাগান বাঙালির আদি শিল্প মাধ্যম। সংস্কৃতির এই শেকড়মুখী দৃষ্টি আবিদের কবিতার অন্যতম চেতনা। যাত্রা যে কমে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারÑ এই খবরটিও পাওয়া যায় ‘যাত্রা দেখেছিলে সেই কবে কোন শৈশবে’ উক্তির মধ্যে। আবার একেই তিনি জীবনের অবিভাজ্য সত্তার সঙ্গে গেঁথে দেন একই সুতায়। গোটা পৃথিবী রঙ্গমঞ্চ আর মানুষসকল অভিনেতা-অভিনেত্রী। সেই জীবনের যাত্রা শেষে ভাঙা মঞ্চের বাইরের একটি শাদামাটা দৃশ্যকে কবি করে তোলেন চিত্ররূপময়। এই কবিতার মধ্যে ছোট একটি গল্প আমরা টের পাই। সেই গল্পই আবিদ আজাদের কণ্ঠে হয়ে ওঠে গীতিময়:

…..। একজন অত্যন্ত সাধারণ মানুষ আর একজন অতি সাধারণ মানুষীর
দাম্পত্য জীবন কি ভাবে সাদামাটা ভয়ংকর স্বপ্নের দাঁতে সারাক্ষণ ছিঁড়ে যেতে-যেতে
প্লাবন ও পরিমার্জনার পৃথিবীতে ঝলমল করতে থাকে আজ আর তাও আমি বুঝতে
চাই না। কারণ মৃত্যু, যে মরে তার নয় Ñ মৃত্যু, যে বাঁচে, বেঁচে থাকে, তার। বৃষ্টি ও
কুয়াশা জীবিতদের পাঠ্য বলেই কি আমি আর দাঁড়াতে পারি না তোমার ছবির সামনে
মুখ তুলে?
(তোমার ছবির সামনে : আরো বেশি গভীর কুয়াশার দিকে)

আবিদ আজাদ তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু করেন চারপাশের চেনাজানা বৃত্ত থেকে। তাঁর কবিতায় জড়িয়ে থাকে সূক্ষ্ম অনুভব চিত্র যা সহজে বোঝা যায়। চিত্রকল্প রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন যা কিনা শব্দের সক্ষম ধারায় করায়ত্ত। তাই এই কবির কবিতায় চেনা পৃথিবীর বিন্যাস দ্যোতনা স্পষ্টত জাদুকরী স্পর্শে মূর্ত। তাঁর কবিতায় রয়েছে এক অনিঃশেষ কৌশল যার মাঝে বিরাজমান স্বতন্ত্র আঙ্গিক ও উপাদান।

আগেই বলেছি আবিদের কবিতায় রয়েছে গীতলতা, এমনকি দীর্ঘকবিতা যা কিনা বর্ণনাধর্মী, সেখানেও রয়েছে গীতিময়তা। এই সব কবিতা যেন ধীরে প্রবাহিত কোন স্রোতস্বিনী, যাত্রাপথে ক্রমেই বাঁক বদল করে কিন্তু থামে না। অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির অলিতে গলিতে তিনি নির্মাণ করেন কবিতার শরীর। প্রাত্যহিক জীবনের খুঁটিনাটি প্রসঙ্গও তাঁর পরশে কবিতার গাঁথনে পায় বিশিষ্টতা। মানুষের যাপিত জীবনেরই মৌল অংশÑ অভাব, প্রেম, রোমাঞ্চ, বিরহ, বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা-সাফল্যÑ এই সমস্ত কিছুই আবিদ আজাদ প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর নিজের জীবনেই। সুতরাং আবিদ আজাদের কবিতার জগৎ যে ভাবে বিকশিত তা যেমন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, তেমনি অতিপ্রাকৃত পরাবাস্তবতার আলোক বিচ্ছুরণও বটে। আর এ দুইয়ের যোগসাধনে তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে বয়ে যায় এক সুরেলা পাখির গীতস্বর:

তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?
মন-গড়া বৃষ্টি নিয়ে মন-গড়া ট্রেন
মন-গড়া রেললাইন ছেড়ে দিয়ে ঝিকঝিক ধোঁয়ার বহর নিয়ে থামে এসে
তোমার ঘুমের মশারির কাছে? বালিশের পাহাড়ের কাছে?
ঘাসের কাছের কোনো এক ইস্টিশানে?
(তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে? : তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?)

আবিদ আজাদের কবিতা স্বচ্ছন্দ পাঠের কবিতা। শব্দ নির্বাচনে, প্রয়োগে ও সৃষ্টিতে আবিদ অতিশয় সতর্ক। ক্লিশে শব্দ পরিত্যাগ করে ব্যঞ্জনাধর্মী নতুন যৌগিক শব্দের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ঈর্ষণীয়। শব্দের অর্থের পাশাপাশি ধ্বনিসংগতিও তাঁর বিবেচ্য বিষয়।

আবিদ আজাদ ইতিহাসগত ভাবে বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকের পূর্ববঙ্গীয় কবিকুলের সদস্য হিশেবে বিবেচিত হলেও তাঁর তারুণ্যে রচিত কবিতায় মৃত্যু প্রসঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত, যুক্তিবিরোধী কোন মোহাচ্ছন্নতা পরিলক্ষিত হয় না। বরং তাঁর প্রথম পর্যায়ের কবিতা ছিল অসঙ্কোচ গীতিময়তার জন্য প্রসিদ্ধ। তবে মধ্য পর্যায়ে তিনি তাঁর ঐ কিংবদন্তীখ্যাত গীতিময়তা থেকে কিঞ্চিত বিচ্যুত হন। এরও কারণ হিশেবে বলা যায় সম্ভবত বিভিন্ন জাগতিক কারণে, এমনকি নিজের জীবনেও ঘটে যাওয়া নানা সংঘাত, টানাপোড়েন, উত্থানপতনের ভিতরে তাঁর কবিতার ঐ বিশেষ চরিত্রলক্ষণ প্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল।

কিন্তু হাসপাতালের রোগশয্যায় রচিত এবং কবি আবিদ আজাদের মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘হাসপাতালে লেখা’ কাব্যের কবিতাগুলোতে পাঠক আবিষ্কার করেন সেই পুরাতন পরিচিত গায়কপাখিকে। এই শেষতম কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলোতে পুনরায় তাঁর পরিচিত নির্ভর গীতিময়তা বেশ স্পষ্ট, যা তাঁর পুরনো পাঠকের জন্যে গভীরতম অর্থে তৃপ্তিদায়ক:

মৃত্যুর হাতকে আজ পরিচ্ছন্ন মনে হলো খুব
জীবন, প্রতিষ্ঠা, গ্লানি সব তার মুঠোয় লুকালো

কৃতি, খ্যাতি, সম্ভাবনা, পুরস্কার সব আজ চুপ
তিন পুত্র বাবার শরীর নুয়ে কাফন পরালো।
(মৃত্যুর হাত : হাসপাতালে লেখা)

গীতিময়তায় কবি আবিদ আজাদ চিলেন তাঁর প্রজন্মের মধ্যেও অগ্রবর্তী। সমসাময়িক অন্য কোন কবির রচনা অকস্মাৎ বিসদৃশ বিদেশী প্রসঙ্গ দ্বারা ভারাক্রান্ত হলেও আবিদ আজাদ তাঁর কবিতাকে সর্বদাই সচেতন ভাবে অনাবশ্যক ভারমুক্ত রেখেছেন। আবিদের কবিতায়, বিশেষত তাঁর প্রথম পর্যায়ের কবিতায় দুর্লভ এক গতি সঞ্চারিত হয়েছে, যা তাঁর কবিতাকে পৃথক ভাবে চিহ্নিত করে রাখে।

মূলত কবিতা রচনার প্রয়োজনে আবিদ আজাদ একটা নতুন আধার অর্জনের উপর জোর দিয়েছেন বেশি, তা হচ্ছে কবিতায় গীতলতা। পরবর্তীতে নির্মাণ কুশলতার ভিতরে গভীর চিন্তার অনুশীলনে কবিতায় ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুটন স্পষ্ট করে তুলেছেন।

বাংলাদেশের কাব্যভুবনে আবিদ আজাদ আজ একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও সার্বভৌম নাম। সৃষ্টিশীলতার পথে বিবর্তিত হতে হতে উত্তরণের পর উত্তরণের মধ্য দিয়ে তিনি আবহমান বাংলা কবিতার ধারাকে পৌঁছে দিয়েছেন বর্তমানের জীবিত উপত্যকায়। তাঁর কবিতা বর্ণিল ও চিত্রল, বিষয়-পরিধিতে বিপুল ও বহুবিচিত্র। পরিশ্রুত বাংলা গীতিকবিতা বিশুদ্ধ ও চূড়াস্পর্শী এবং পরিণত কাব্যরূপ লাভ করেছে কবি আবিদ আজাদের ঈর্ষণীয় কুশলতায়। ফলে আবিদ আজাদ সত্তরের দশকের অন্যতম প্রধান কবি হওয়া সত্বেও, তিনি আজ দশকের গ-ি পেরিয়ে বাংলাদেশের কবিতার এক অনিবার্য ও গুরুত্বপূর্ণ কবি হিশেবে সকলের কাছে বিবেচ্য।

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close