আমার চোখে

খন্ড চিন্তা

মুহাম্মদ আব্দুল খালিক

১.
মানুষের জীবনের সবকিছুই ‘পেন্ডুলাম’ (Pendulum)-এর মতো। এদিক থেকে ওদিকে হেলে পড়ে। কোনো একদিকে স্থায়ী হতে চায় না। চাওয়া-পাওয়া, আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, উত্থান-পতন এসব কিছু পেন্ডুলামের মতোই যেন মানুষের জীবনে আনাগোনা করে।

২.
যখন কোনো উপন্যাস পড়ি বা কোনো ফিল্ম দেখি, তখন কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থান দেখার চেষ্টা করি। লক্ষ্যণীয় হলো, ভালো লাগা উপন্যাস বা ফিল্মের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। খ্যাতনামা কোনো উপন্যাস কিংবা ফিল্ম শেষ করে আমরা হয়তো ভাবিÑ এর কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতো যদি হতে পারতাম!
কিন্তু আমরা কি তার আর্থিক দৈন্যতা গ্রহণেও আগ্রহী হই? প্রশ্ন থেকে যায়।

৩.
সাফল্যের নির্দিষ্ট গন্ডি নেই। আপাত দৃষ্টিতে কোনো একটা অবস্থানকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরলেও ঐ জায়গায় পৌঁছার পর দেখা যায় যে, সফলতা রয়ে গেছে আরো দূরে।

যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই তখন মনে হয়েছিল এ পরীক্ষায় এ+ পেলে কাক্সিক্ষত সফলতা পাওয়া যাবে। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর বুঝলাম, এটা তেমন বড় মাপের কোনো সাফল্য নয়। এরকম হাজার হাজার ছাত্র এ+ পেয়ে থাকে। মনে হলো উচ্চ মাধ্যমিকে এ+ পেলে কাক্সিক্ষত সফলতা পাওয়া যাবে। কিন্তু না তাও সফলতা বলে মনে হলো না। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্টে ভর্তি হতে হবে। মেধা তালিকায় স্থানাধিকার করে ভালো সাবজেক্টও পাওয়া হলো। শেষ হলো অনার্স। মাস্টার্সও শেষ হওয়ার পথে। তবু মনে হচ্ছে এটাও সফলতা নয়। এগুলো খুব একটা তৃপ্তিদায়ক বিষয় মনে হয় না।

এ পর্যন্ত চলতে গিয়ে যে ছোটোখাটো ভালো কাজ করেছি। মানুষকে যে ছোটোখাটো সেবা দিয়েছি। নিজের মধ্যে মূল্যবোধ তৈরির জন্য যে পড়াশোনা বা কাজে যুক্ত থেকেছি তাই আমার মাঝে মানসিক প্রশান্তি প্রদান করে। দুনিয়ার মাপকাঠিতে আপনি যে অবস্থানেই পৌঁছান না কেন, তা আপনাকে মানসিক প্রশান্তি দান করবে না যদি আপনি মূল্যবোধের জায়গা থেকে প্রশান্তি না পান।

৪.
বেশ কিছু দিন আগে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম ‘ভালোবাসা শব্দটিতে আগ্রাসন’ শিরোনামে। সে লেখায় দেখিয়েছিলাম চমৎকার আবেগপূর্ণ এ শব্দটিকে কীভাবে সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আমাদের সিনেমা-নাটক-সাহিত্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীর প্রতি কামনা বা প্রেম বুঝাতে ‘ভালোবাসা’ শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু এটি কোনো সংকীর্ণ অর্থ প্রদানকারী শব্দ নয়। এটি একটি সার্বজনীন শব্দ। এটি সকলের জন্য।

এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে, কারো কাছ থেকে ভালোবাসার প্রতিদান আশা করা যায় না। ভালোবাসাটা হতে হয় নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত। তবে মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিদান প্রত্যাশা করে থাকি। একথা ঠিক যে, কোনো কিছুর বিনিময় হলে তা স্থায়ী হয়, হয় মধুর ও আনন্দপ্রদ। কিন্তু আমাদের সমাজে তা হতে দেখা যায় খুবই কম। তাই ভালবাসতে চাইলে তা একান্তই হতে হবে মানবিকতার দাবিতে। আপনি যদি কারো কাছ থেকে বিনিময় প্রত্যাশা করে থাকেন তাহলে তা না পেলে আপনার মনঃকষ্ট হবে। আপনি ভুগতে পারেন মানসিক যাতনায়। এটি আপনাকে সবাইকে ভালোবাসা থেকে এক সময় বিরত রাখতে পারে।

ভালোবাসার সাথে আপনার যে গুণটি দরকার তা হলো, ক্ষমা করার গুণ। এটি মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বিধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সময় আপনি যার উপকার করছেন সে উপকার স্বীকার করা তো দূরের কথা আপনার অপকার করে বসতে পারে। অনেক সময় সমাজের মানুষ আপনার সংস্কারমূলক কাজে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়াতে পারে। আবার দেখা যাবে তারা আপনার অবস্থান, পদ, যোগ্যতা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করছে কিংবা আপনার নামে ছড়িয়ে দিচ্ছে আজে-বাজে সব কথা। এসবকে দূরে ঠেলে তাদেরকে ভালোবাসতে চাইলে আপনার মধ্যে থাকতে হবে ক্ষমা করার গুণ।

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of

আরোও দেখুন

Close
Close