আমার চোখে

বাংলাদেশ সংবিধান বনাম কোটা পদ্ধতি

নিউটন মজুমদার

সংবিধান হচ্ছে যেকোন রাষ্ট্রের দর্পণ স্বরূপ। রাষ্ট্র পরিচালনার সকল আইন-কানুন এতে সন্নিবেশিত থাকে এবং এটি রচনাও হয় যেকোন রাষ্ট্রের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়সমূহ বিবেচনাপূর্বক।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরবর্তী বাংলাদেশে ৭২-এ রচিত হয়েছিল এক সাম্যবাদী সংবিধান, যার প্রস্তাবনায় উল্লেখ ছিল- ‘আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ অর্থাৎ তৎকালীন যুদ্ধ পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকার অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, দেশের দ্রুত সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন সমাজের সকল স্তরের মানুষের সমান্তরাল ও সম সুযোগ-সুবিধা বণ্টন ব্যতীত সম্ভব নয়। তাই তিনি এমন এক সংবিধান প্রনয়ন করতে চেয়েছিলেন, যা হবে প্রকৃতই মানবমুক্তির হাতিয়ার। যেখানে থাকবে না কোন বৈষম্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, যে প্রস্তাবনাটি এখন অবধি বাংলাদেশ সংবিধানে দণ্ডায়মান থাকা সত্ত্বেও এটি হয়তো আমাদের রাষ্ট্রনেতাদের দৃষ্টিতে প্রতিভাত হয়নি!

এবার দেখা যাক, বাংলাদেশ সংবিধান বর্তমান কোটা ব্যবস্থা সম্পর্কে কি মতবাদ দেয়। প্রথমত, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৯ অনুচ্ছেদের দফা-১ এ বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন। দফা-২, মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। দফা-৩, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়- এ ল্যাটিন প্রবাদটিকে সামনে রেখে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টত বলা হয়েছে- ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা বলতে সকল মানুষের নিরঙ্কুশ সমতা বুঝায় না, তবে এটা স্বীকার্য বলে গণ্য করে যে, জন্ম বা ধর্মবিশ্বাসের দরুন বা এরকম কোন কারণে কোন ব্যক্তিকে কোন বিশেষাধিকার প্রদান করা হবে না।’ অর্থাৎ সংবিধানে বলা হয়েছে, একজন সাধারণ নাগরিক এবং একজন অপরাধী আইনের দৃষ্টিতে কখনোই সমান হবে না। কিন্তু এখানে জন্ম বা ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে কোন নাগরিকের জন্য আলাদা আইন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ আমি আমার জন্যে কোন বিশেষ আইনের সুবিধা লাভ করলেও আমার পরবর্তী প্রজন্ম উত্তরাধিকারসূত্রে তা প্রাপ্ত হবে এমন কোন বিধান সংবিধান দেয়নি। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এখন নিয়ম হয়েছে, অনগ্রসর শ্রেণির কোনো প্রার্থীর পিতা কিংবা মাতা দ্বিতীয় শ্রেণি বা তার ওপরের সরকারি বা অনুরূপ বেসরকারি চাকরি করলে কিংবা একটি নির্ধারিত পরিমাণ বার্ষিক আয় হলে সেই প্রার্থী কোটা সুবিধা পাবে না। আর কেউ সেই সুবিধার আওতায় চাকরি পেলে তার পরবর্তী প্রজন্ম তা পাবে না।

তাহলে আমরা কেন এই কোটা পদ্ধতির অদৃশ্য জাল হতে বের হতে পারছি না?

সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা প্রসঙ্গে দফা-১ এ সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। দফা-২, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ তবে এ অনুচ্ছেদের দফা-৩ এর উপ-দফা(ক), (খ) এবং (গ)-তে নাগরিকদের অনগ্রসর অংশের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, ধর্মীয় বা উপ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে এবং নারী বা পুরুষের জন্য বিশেষ বিশেষ কর্মক্ষেত্রে রাষ্ট্র তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়নের কথা বলছে। অর্থাৎ সংবিধানের এ অংশে সর্বাগ্রে প্রত্যেক নাগরিকের যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের সমসুযোগ প্রদানের বিধান দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে কোনরূপ বৈষম্য প্রদানকেও সংবিধান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অতঃপর পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে সামনে আনার লক্ষ্যে এবং কিছু বিশেষ প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে একটু ছাড় দেয়া হয়েছে। যেমন: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিধিত্ব বা স্বাস্থ্যবিভাগের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হতে পারে। তবে তা কখনোই মেধাকে ছাপিয়ে নয়!

দেশের জনপ্রশাসন আজ মেধাশূন্যতায় ধুঁকছে। বর্তমান প্রতিযোগীতামূলক পুঁজিবাদী উন্নত বিশ্বে নিজ অস্তিত্বকে সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে মেধার গুরুত্বের কোন বিকল্প পন্থা নাই। ১৯৭২ সালে জাতির পিতার হাত ধরে আসা সংবিধানেও ছিল মেধার গুরুত্ব সর্বাগ্রে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে কেন আমরা পিতার নির্দেশিত পথে হাঁটতে পারছি না? কেন আজ আমরা উল্টো যাত্রায় প্রথম?

বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারেরই (গুটিকয়েক রাজাকার ব্যতীত) স্বাধীনসংগ্রামে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আত্মত্যাগ ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ৩০ লাখ শহীদগণও সোনার বাংলার মাটিতে কোন বৈষম্য আশা করেননি। এমনকি তারা সেদিন কোন বিশেষ সুবিধার কথা চিন্তা করে যুদ্ধে ঝাঁপ দেননি। এজন্যই তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তবে আমরা কেন আমাদের দোষে তাদের প্রকৃত সম্মানকে ভুলুণ্ঠিত করছি?

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of

আরোও দেখুন

Close
Close