আমার চোখে

পত্রালাপে নজরুল

ফয়সাল আহমেদ রায়হান

বর্ধমানের শক্তি পত্রিকার সম্পাদক বলাই দেবশর্মাকে লিখিত কবি নজরুলের একটি পত্র ছিল এমন –

‌‌ হুগলি
৩১শে শ্রাবণ ১৩৩২

শ্রীচরণেষু

বলাইদা! আবার তুমি ‘শক্তি’র হাল ধরে ভয়ের সাগরে পাড়ি দিলে দেখে উল্লসিত হয়ে উঠলাম। ধূমকেতুতে চড়ে আমার আরেকবার বাংলার পিলে চমকে দেয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু গোবর মন্ত ( সরকার ) সাহেব পেছনে ভীষণ লেগেছে। কোনক্রমেই একে উঠতে দিবে না। তাই ‘বারো বাড়ি তেরো খামার যে বাড়ি যাই সে বাড়ি ই আমার’ নীতির অনুসরণ করে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বাংলার আবহাওয়া বড্ড বেশি ভেপসে উঠেছে এবং তাতে অনেক না দেখা জীবের উদ্ভব হয়েছে। এখন একজন শক্ত বেটাছেলের দরকার – যে কোদাল হাতে এগুলোকে সাফ করবে। লাভ-লোভকে এড়িয়ে চলার অসম-সাহসিকতা নিয়ে তবে এতে নামতে হবে। যাক , তুমি যখন নেমেছ তখন কিছু একটা হবে বলে জোর আশা করছি। দেখো দাদা, তুমিও শেষে ভেস্তে যেয়ো না। এ ধুমকেতুল্যাজাও পেছনে রইল; নুড়ো জ্বালাবার আগুনের জন্য যখনি দরকার হয় চেয়ে পাঠিও। আর একটি কথা দাদা, মহাত্মা হবার লোভ কোরো না।

ইতি

তোমার স্নেহধন্য
নজরুল

পত্রটি থেকে নজরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বিষয় স্পষ্টত ধারণা করা যায়। নজরল ধমকেতু পত্রিকার মাধ্যমে সত্য প্রকাশের এক মহাসাহস নিয়ে ছিলেন একসময়। সরকার এর পেছনে লাগায় তখনকার মতো ধূমকেতু প্রকাশ বন্ধ হতে যায়। ওই সময়ে বলাই দেবশর্মা ‘ শক্তি ‘ পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। নজরুল যেনো ধুমকেতুর সেই স্বপ্নটিই দেখতে পান শক্তি পত্রিকার প্রকাশে। তিনি শক্তি পত্রিকাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে দেখতে পেয়েছিলেন তার স্বপ্নেরই অন্য এক প্রকাশ।

সাধারণ মানুষ আর নজরুলের পার্থক্য ঠিক এখানেই । নজরুল ছিল সত্যিকার অর্থেই সপ্নের বিলাসী , স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাকে নিয়ে। যখন আশাহত হলেন নিজের সম্পাদিত ধূমকেতু নিয়ে ঠিক তখনই আবার বলাই দেবশর্মার সম্পাদিত ‘ শক্তি ‘ মনে জাগিয়ে তুললো আশার জোয়ার। এখানে তিনি সম্পাদনা কে করছেন মূখ্য না ভেবে মূখ্য ভেবেছিলেন স্বপ্ন কি দেখেছিলেন তা।

মাঝে মাঝে এমনও হতে পারে আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আপনি নিজে কিছু করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হলেন , কিন্তু দেখতে পেলেন অন্য কেউ একই স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন সে কাজটি আপনার স্বপ্নেরই পরিপূরক মনে করে তাকে উৎসাহিত করুন, তার পাশে থাকার সাহস জোগান ঠিক যেমন নজরুল বলাই দেবশর্মকে সাহস জুগিয়েছিলেন এই বলে – ” দেখ দাদা তুমিও শেষে ভেস্তে যেয় না। এই ধুমকেতুল্যাজাও ( ধূমকেতুর সম্পাদক; এখানে একই স্বপ্নের বাহক) পেছনে রইলো; নুড়ো জ্বলাবার আগুনের জন্য যখনই দরকার হবে চেয়ে পাঠিও। ” স্বপ্নগুলো একীভূত করে এগিয়ে যান। ব্যক্তিগতভাবে আপনি সফলতায় নজর না দিয়ে স্বপ্নের‌ বাস্তবায়নে নজর দিন। ঠিক যেমনটি নজরুল করেছিলেন।

পত্রের শেষান্তে তিনি একটি পরামর্শও দিলেন বলাই দেবশর্মাকে- “মহাত্মা হবার লোভ করো না”। অর্থাৎ তুমি যে পথে নামবে মহাত্মা হবার লোভ করবে না, নিজের স্বপ্নে কাজ করে যাও, স্রোতের বিপরীতে গেলে বাঁধা পেয়ে ধূমকেতুর মত থেমে যাবে হয়তো। হয়তো আবার কেউ সেই স্বপ্ন নিয়ে এগিয়েও আসতে পারে; তখন তার পাশে থাকুন। কিন্তু মহাত্মা হতে গিয়ে যুগের হা কে হা, না কে না মিলালে ক্ষণকালে মহাত্মা হয়তো হওয়া যাবে কিন্তু কালের গর্ভে স্বপ্নের রূপ হারিয়ে যাবে, জ্ঞানপাপীর গণ্ডিতেই ঠাই পাবে আপন নাম।

এজন্যই আমরা স্বপ্নের পূজারী হবো ,কিন্তু সবসময় যে আমাকেই পুরোহিত হতে হবে তাও নয়। পুরোহিত আমি হই কিংবা অন্যকেউ স্বপ্ন যদি এক হয় আমি তার পুজাই করবো।

যেনো এক মহৎ প্রাণের এবং একনিষ্ট স্বপ্নদ্রষ্টার পরিচয় পাওয়া যায় নজরুলের এই পত্রের স্বরূপে।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of

আরোও দেখুন

Close
Close