আমার চোখে

ছদ্মবেশ!

ফয়সল আহমেদ রায়হান

কিছুদিন আগে কল্যাণপুর থেকে ফিরছিলাম টিউশন শেষ করে। বাসেই আসা-যাওয়া সবার মতোই। রাস্তায় ভালই জ্যাম ছিল। বাস এক মিনিট যায় তো ৫ মিনিট থেমে থাকে। একটা বিরক্তিকর সময়। এই বিরক্তি কাটাতে সবসময় বাসে বসে কিছু না কিছু ভাবতে থাকি। মাঝে মাঝে ভাবনাগুলো এতই ভালো লাগে যে, সময় তো যায়ই বরং মনে হয় বাসটা আরেকটু থেমে যাক, ভাবনাগুলোর সমাপ্তি হোক। কিন্তু থেমে থাকলে তো আর চলবে না । আচ্ছা যাই হোক এবার আসি আসল কথায়।

অনেকক্ষন জ্যামে আটকে থাকায় বিরক্ত লাগছিল খুব। বাইরে তাকালাম। এদিক ওদিক দেখছিলাম। একটা বাস এর পেছনে চোখ গেল। কিছু কথা লিখা ছিলো এমন – “অনুশোচনা খারাপ কাজকে আর অহংকার ভালো কাজকে ধ্বংস করে দেয়”। আরেকটি ছিল এমন – “Education lights human life (শিক্ষা মানব জীবনকে আলোকিত করে)”

স্বভাবত গাড়ির পেছনে এমন নীতিমুলোক কথাগুলোই লিখা থাকে। এসব নিয়ে ভাবার কি আছে! ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি! কিন্তু না, ঐযে বললাম বাস এ খুব সূক্ষ্ম জিনিস নিয়েও চিন্তা করি , সময়ও কাটে আবার বিরক্তিও আসে না।

আচ্ছা বাস এর পেছনে যিনি বা যারা এই লিখাগুলো লিখেন তিনি বা তারা কি খুবই শিক্ষিত? উত্তর – না। কারণ অত শিক্ষিত হলে উনি পাবলিক বাস এর পেছনে লিখার কাজটা অন্তত করতেন না।

তাহলে অশিক্ষিত অথবা স্বল্পশিক্ষিত মানুষগুলো এমন নীতি বাক্য কেনো লিখেন? কি ই বা তারা চান? কখনো ভাবনা এসেছে!

: আসলে তারা নিজে শিক্ষার আলো না পেলেও শিক্ষাকে সম্মান করতে জানে। আসলে তারা মূর্খ! তাই হয়ত এখনো মনে করে সত্যিই এ শিক্ষা মানুষের জীবনকে আলোকিত করে তোলে! শিক্ষার কাছে , জ্ঞানীদের কাছে তাদের আবেদন থাকে। তারা মনে করে -“‌হ্যাঁ একদিন শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে তুলবে। সেই আলোর সংস্পর্শে তাদের জীবনও আলোকিত হবে। বাসের পেছনে এইসব নীতিবাক্য লেখার মাধ্যমে আমি যেমন শিক্ষার প্রতি তাদের সম্মান দেখতে পাই,তেমনি দেখতে পাই শিক্ষিত মূর্খতার প্রতি ঘৃণা ।

স্কুল/ কলেজে না যাওয়া একজন লোক জানে এবং সে মানেও শিক্ষা মানেই আলো। প্রকৃতার্থে শিক্ষা মানেই তো আলো হাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা ভার্সিটি পড়ুয়া, ডিগ্রীধারী মানুষজন তাদের সেই আশার আলোকে নিভাতেই শিক্ষিত হই। তাদের শোষণ করার জন্যই আমরা এই শিক্ষা ব্যবহার করে থাকি। তাহলে সমস্যা টা কোথায়? তাদের ভাবনায় নাকি আমাদের আচরণে।

সত্য বলতে শিক্ষা যে আলো এ বিষয়টিই বুঝতে সক্ষম না আমরা। একটা মোমবাতি তার নিজের চেয়ে চারপাশ বেশি আলোকিত করে বলেই সে আলোকিত, আলোর উৎস। আর আমরা! আমরাও আলোকিত হতে চাই তবে চারপাশের আলো কেড়ে নিয়ে। তবে আসলেই কি আলোকিত হতে পারি? আমি বলবো – না।

যে আলোর শিখা নেই, যে আলো বিচ্ছুরিত হয় না, আলোকিত করে না তাকে আলো বলাটা এই বিজ্ঞানের যুগে মূর্খতা নয় ডাহা মিথ্যা কথা। সে আলো আলো নয়, অন্ধকারেরই এক নতুন নাম। ঠিক তেমনি যে শিক্ষার বিচ্ছুরণ নেই, যে শিক্ষা সীমাবদ্ধ, যে শিক্ষায় মানবতার কল্যাণ নেই সে শিক্ষা শিক্ষা নয়, সে শিক্ষা অশিক্ষা। এই অশিক্ষার যুগে, মূর্খতার বেশে আজ সমাজে হাজারো শিক্ষিতের বাস। তাদের নেই কোনো লাজ, নেই কোনো কাজ। আছে শুধুই ছদ্মবেশ! আলোর নামে অন্ধকারের বিচ্ছুরণ!

ভেবে দেখলাম- এই অদ্ভুত ভাবনাগুলো যদি সেই অশিক্ষিত মানুষগুলো ভাবতে জানতো! তাহলে বাস এর পেছনে লিখা থাকতো “শিক্ষার নামে অশিক্ষা বন্ধ হোক/ শিক্ষাই কেড়ে নেয় আলো/ শিক্ষা প্রথার উচ্ছেদ চাই ।”

তারা হয়ত কোনো একদিন সভা করতো; স্লোগান তুলতো- ” শিক্ষা প্রথা বন্ধ চাই, শিক্ষার কোনো দরকার নাই।”

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close