আমার চোখে

একটি শিশুতোষ রাজনীতির বয়ান

রাহিল আবরার

‘ক্ষুধার্ত অবস্থায় বিপ্লব অসম্ভব’। প্রতিদিন ঘরে ঢুকেই আমার ডায়েরির প্রথম পাতায় এই অবিস্মরণীয় বচন গেলার চেষ্টা করি। সম্পূর্ণ গিলতে না পারলেও কিছুটা গিলে বাকিটা কুলকুছি করে ছেড়ে দেই, যেমনটি একজন ধূমপায়ীর হরহামেশা ব্যাপার। এই অমীয় সুধা কোন কালে কে লিখেছিলেন সেটি আপাতত না বলি। প্রতিদিন আরেকটি বচনের পোস্টমর্টেম করতে হয় আমাকে-‘মানুষ একটি রাজনৈতিক প্রাণী’। এটি রাজনীতির খেলাঘর থেকে গুরু এরিস্টটলের অরাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে আপাতত মেনে নিন। ওনার ব্যাপারে রাজনীতির সাত-পাঁচ নিয়ে ভাবার আগে আপনার প্রেয়সীর কথা একবার ভাবুন। কারণ একজন রাজনৈতিক প্রাণী হিসেবে মাঝে মধ্যে আপনি উনার সাথে রাজনীতির রসায়নে বিক্রিয়া ঘটাতে পছন্দ করেন। সেটি যে উনিও করেন না, সেই গ্যারান্টিও আমি আপনাকে দিতে পারছি না।

আচ্ছা, আসুন শুরুর কথায় থিতু হওয়া যাক। এই নগরে কত শত ভুখা নাগরিক আসে, সেটি ক্যালকুলেটরের হিসেবে বন্দি করা যাবে না। তারা বিপ্লবী হতে হতেও তো শেষতক বিরতী নেয়। নিরূপায় ওই ভুখারা প্রিয়জনের কাছেই অঘটিত বিপ্লবের গল্প শোনাতে পছন্দ করেন। কিন্তু তার বিপরীতে খাদক টাইপের অতিবিপ্লবীর চেঁচামেচিও তো কম শোনা যায় না। শাহবাগের মোড়ে অদূরে কোথাও মাইকের আওয়াজে নেহেরু স্টাইলে বলতে শোনা যায়, ‘ইয়ে আজাদী জুটা হ্যায়’। সেসব মাইকের আওয়াজে ভুখা মানুষের কষ্টের কথা বেশি থাকলেও ঠিক সে সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভিক্ষুকের কি আসে যায়? ওই ভিক্ষুক শাহবাগের ওই ভাষণকে গুহাবাসির চিৎকারের সাথেই মিশিয়ে নেন। গুহাবাসির চিত্র কি? একটু মনোজগতে ঢুঁ মারুন তো! আমি জানি আমার সাথে আপনি গুহাবাসির দরজায় মেহমান। তাদের গল্প কি? তাদের কাছে বাইরে থেকে খবর আসে, আসে বার্তাবাহক। সেসব খবরে উত্তেজনা, ভয়, রাগ, আশা এবং আর যা যা হওয়ার সব হয়। তারা অতুচ্ছ্য যোদ্ধা। এই গুহার মধ্যেই যেন গোটা দেশ, পরিবার, দল, ব্যক্তি, নারী, পুরুষ, শিশু। ওই গুহার চৌহদ্দির মধ্যেই কারো কারো মধ্যে বাড়ে অবিশ্বাস, কারো কারো মধ্যে প্রেম হয়। এই গুহার ভেতরেই একটি কাল্পনিক সাম্যবাদী সমাজ কায়েমের দুর্বোধ্য প্রয়াস খোঁজে তারা। আদতে তারা ব্যর্থ।

ওই ব্যর্থ জগতের যে কেউ আবার মরতে মরতে ফিরে এসে সুসভ্য হয়। সে সংখ্যা হাতে গোনা। সে ভিক্ষুক জানে কুমিল্লার ধর্ষিতা তনুর মৃত আত্মার আর্তচিৎকার এখানে পৌঁছায় না। তার কাছে ভারতের শিশু তাসফিয়ার চিৎকার, র‌্যাবের ক্রসফায়ারের গুলির শব্দ, সীমান্তে বিএসএফের পাখির মতো মানুষ হত্যা কিংবা আফগানিস্তানে হেফজখানায় মার্কিনিদের বোমায় কয়েকডজন হাফেজ হত্যা কিংবা দখলদার জায়নবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা রক্ষার অবিরত যুদ্ধের স্লোগান আর শাহবাগের গুহায় অনুর্বর বিপ্লব-সব যেন একাকার হয়ে মিশে যায়। এসব ভুখা ভিক্ষুকের কাছে অজানা থাকে তাবৎ দুনিয়ায় তার মতো ঠিক কত মানুষ অনাহারে। বিশ্ব মোড়ল জাতিসংঘ অবশ্য তাদের নিয়ে একটু আধটু ভাবার সময় পেয়েছে বলে মনে হয়। তাদের এসব হিসেব নিকেশে আবার কারও কারও পকেট ভারী হয়। কার পকেট ভারী হয়, হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক লুটপাটের এদেশের মানুষকে হাতে কলমে শেখাতে হবে না আশা করি।

আসুন জেনে নিই কি বলছে ওই বিশ্ব মোড়লরা। জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের চরম ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েই চলছে। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ৮ কোটি থাকলেও ২০১৭ সালের শেষে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৪০ লাখে। আর ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ২০১৫ সালে ছিল ৭৭ কোটি ৮০ লাখ যা এখন ৮১ কোটি ৫০ লাখ। ক্ষুধার্ত ও চরম ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতাকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে গত মার্চে। এবার বুঝুন পৃথিবীর সব মানুষ বিপ্লবী হওয়ার দরকার কি? আইএসের মতো সন্ত্রাসীদের মাথামোটা বলেই তো মনে হয়। বিপ্লব যখন করবেই তোমরা, তবে এই সাড়ে ১২ কোটি ভুখাকে খাইয়ে দাইয়ে বিপ্লবী বানাও। করপোরেট বিশ্বকে কিয়ামত পর্যন্ত বুঝিয়েও যে হেদায়াত করা যাবে না সেটা শয়তানও ভালো বোঝে, বোঝে না ধ্বংসের কারিগররা।

এই সমাজের কর্তাব্যক্তিরা বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে এখনও অবুঝ শিশুর কাতারে ভাবতে পছন্দ করেন। শিশুদের যেমন ঠকানো যায়, এই অগ্নিগর্ভের তরুণদেরও সহজে ঠকানোর সহজ রাস্তা বেছে নিয়েছে করপোরেট জাদুকরেরা। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার পেছনে যেমন শিশুরা গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলো, করপোরেট বেশ্যাদের জাদুর বাঁশির সুরেও তরুণ সমাজ কোথায় যেন তলিয়ে যাচ্ছে।

গত ১৭ এপ্রিল দেশের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টচার্যের সংবাদ সম্মেলনের দেয়া তথ্য কলিজা কাঁপানোর মতো অবস্থা। তার ভাষায়, দেশের প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ফলাফল যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় দেশে আয়হীন কর্মসংস্থান বাড়ছে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় তিন বছর ধরে একই জায়গায় আটকে আছে। মুদ্রানীতিতে ঋণের লক্ষ্য মাত্রা ১৬ দশমিক ৫ ছাড়িয়ে হয়ে গেছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন করেন, এত টাকা গেল কোথায়? আয়হীন কর্মসংস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পুঁজিপণ্য আমদানিও বাড়ছে। ব্যাংকের টাকা যাচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তি বিনিয়োগ তেমন দেখা যাচ্ছে না। এটা কেমন ধরনের কথা। আগামী বাজেটকে সামনে রেখে সংযত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি। প্রবৃদ্ধির হার, আয়ের হার, কর্মসংস্থানের হার এবং উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও এগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। যদি সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে চিন্তার বিষয় বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। জেনে রাখা ভালো প্রতিবছরের এই সময়ে ‘বাংলাদেশের উন্নয়নে স্বাধীন পর্যালোচনা (আইআরবিডি)’ শীর্ষক এই পর্যালোচনা করে থাকে সিপিডি।

এই গবেষণা সংস্থার কি উদ্দেশ্য, বা কার জরিপ নিয়ে এই প্রতিবেদন- তা আমি হিসেব করতে রাজি নই। কারণ, ওই আয়হীন কর্মসংস্থানের তরুণদের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেলে বাকি খবরের সত্যতার জন্য বসে থাকিনা। একবার ভাবুন তো, একটি ছেলে কিংবা মেয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করার পর কতটুকু সংগ্রামী! পরিবারের চাপ, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন এমনকি হৃদয় আসনে স্থান পাওয়া প্রিয়জনের চাপ সে কিভাবে সামলাচ্ছে? এমন অনেক বন্ধুদের খুব কাছ থেকে দেখেছি, যারা কিনা দিনে মাত্র একবেলা খায়। তার কিন্তু চাকরি আছে, অফিসে যেতে হয়, বসের ঝাড়ি শুনতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি পেশাগত জীবনে জড়িয়ে আছে সে। অথচ অফিস বেতন দেয় না চার মাস। সে ছেলেটা ক্ষুধার্ত অবস্থায় অফিসের কাজ করবে কি করে? এক বন্ধু খুব অসহায়ভাবে বলছিলো, ‘দোস্ত, ধার করে চলতে চলতে পাওনাদারের কাছে নিজেকে তো ঠকবাজ মনে হয়।’ তার মতো হাজার তরুণের অসচ্ছল জীবনের এইসব দিনরাত্রিতে কত ছোট ছোট অনুভূতির ফুল ফোটে আর ঝরে, কে তা খেয়াল করে? এসব মৃদু মানুষের মৃদু জীবনের নন্দিত নরকের কথা বলবেন কোন ঈশ্বর?

হাজার ক্ষুধার্তের তরে আমার একটাই আহ্বান, একবার নিজেকে প্রমাণ করুন। আপনি পারবেন। আমি জানি এই আপনার ভেতরেই কত স্ফুলিঙ্গ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। করপোরেট বেশ্যাদের শুধু জানান দিন আপনারা সততার দুনিয়ায় রাজা হচ্ছেন। এই ভুখা দিনের জঙ্গমে বিপ্লব আসবে।

ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ‘ক্ষুধার্ত অবস্থায় বিপ্লব অসম্ভব’ বাণীর প্রবক্তা জর্জ ইলিয়ট। তার নাম মূলত মেরি অ্যান ইভান্স। একজন নারী ছিলেন, লিখতেন পুরুষের ছদ্মনামে। তিনি একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, অনুবাদক এবং ভিক্টোরীয় যুগের নেতৃস্থানীয় লেখক ছিলেন। তিনি সাতটি উপন্যাস লেখেন, তার মধ্যে এডাম বেড (১৮৫৯), দ্য মিল অন দ্য ফ্লস (১৮৬০), সাইলাস মারনার (১৮৬১), মিডলমার্চ (১৮৭১-৭২), এবং ডানিয়েল দেরুন্দা (১৮৭৬), তাদের অধিকাংশই প্রাদেশিক ইংল্যান্ডে পটভূমি এবং তাদের বাস্তববাদ ও মানসিক অন্তর্দৃষ্টি জন্য সুপরিচিত।

আমাদের সমাজ একটি অঘোষিত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ দিনে গ্রাম দূরে চলে গেছে, পরিবারের বাঁধন আলগা হচ্ছে, সংস্কৃতির রস পানসে লাগছে, ভবিষ্যৎ ভরসা দিচ্ছে না। তারপরও বলি, বিপ্লবী, এখনই সময় যুদ্ধ জয়ের।

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of
Close