আমার চোখে

অসমাপ্ত ভাষা আন্দোলন ও অতঃপর

শিশির ইউসুফ

মহান ৮ ই ফাল্গুন, না মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারি? অনুষ্ঠান উদযাপন শুরু ভোর না মধ্যরাত থেকে?
শহীদ মিনারে ফুল দিয়েই দায় শেষ? ভোর বেলা খালি পায়ে হাঁটলেই ভাষার প্রতি কর্তব্য শেষ?
শহীদদের জীবন দানের দিনটি বাংলা কত সনের কত তারিখ?

বলতে পারবেন সেদিন কি বার ছিল? এই দিনে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় তা কি বাঙালি সংস্কৃতি?
অফিসে চাকরির সময় কোন ভাষার মর্যাদা সবচেয়ে বেশি? উচ্চ আদালত চলে কোন ভাষায়?
কোন ভাষায় শিক্ষিতরা সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারি? স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বাংলা কি একেবারেই অচ্ছুত? নতুন প্রজন্ম কোন ভাষায় কথা বলছে…বাংলিশ নাকি হিংলিশ?
টেলিভিশন দেখার সময় কয়টা বংলা চ্যানেল দেখি আর কয়টা ভিনদেশী?
ভাষার চেতনা কি একদিনেই শেষ? কবে বন্ধ হবে এই চেতনা ব্যবসা?
বংলা ভাষার ইতিহাস জানেন কজন শিক্ষিত নাগরিক ? বাংলার জন্য আপনার গাল ভরা বুলি আর নিজ সন্তানের বেলায় ইংরেজির ঠুলি?
কেমন আছেন শহীদ পরিবারের সদ্যসরা? তারা কি পাচ্ছেন কোন ভাতা? আছে কি কোন কোটা?
ভাষা শহীদদের রক্তদান সফল না ব্যর্থ?

অবাক হচ্ছেন? মনে হচ্ছে পাগলের প্রলাপ? অসুস্থ মস্তিকের বিকৃত চিন্তা? না , প্রশ্নগুলোর দিকে আবার তাকিয়ে একটু ভাবুন ,চিন্তা করুন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ।

কি, নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা বাড়ছে, একসময় পরিণত হচ্ছে ঘৃনায়? বিবেকের দংশন শুরু হয়ে গেছে? শহীদদের প্রতি অপমান আর ভাষার অবহেলার জন্য নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে? শহীদদের আত্মত্যাগের উদযাপন তাদের প্রতি তামাশা ছাড়া আর আর ভিন্ন কিছু? এবারো শহীদদের আত্মত্যাগের দিনটি আসবে ,আমরা চালিয়ে যাব আমাদেও গতানুগতিক কর্মকান্ড । কিছু মিডিয়া হযতো দু একটি রিপোর্ট করবে ভাষার অমর্যদা নিয়ে । কিছু দিন এ নিয়ে অলোচোনা সমালোচনা তারপর অন্যান্য ইস্যুও মত এ ইস্যুও আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে চিরদিনের মত ।

“আমরা কি করতে পারি ,যাদের হাতে কিছু করার ক্ষমতা তারাইতো এ ব্যাপারে সবচেয়ে উদাসীন ”। তাইতো ঠিকই বলেছেন ,কিন্তু…… যারা প্রথম ভাষার আন্দোলন করেছেন তাদের কেউ কি রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ছিলেন । দেখা যাক ইতিহাস কি বলে , ১৯৪৭ এর ১৫ ইআগষ্ট পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ১ ই সেপ্টেম্বও ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য কয়েকজন নিরিহ শিক্ষক ও ছাত্রের হাত ধরে গড়ে উঠে তমুদ্দুন মজলিশ নামক একটি অরাজনৈতিক সংগঠন । অল্পসংখ্যক এই নিরীহ শিক্ষক এর ছাত্ররা মিলেই গড়াপোত্তন করেন ইতিহাস খ্যাত ভাষা আন্দোলন । তাদের শুরু করা এই আন্দোলনই অনুপ্রানিত করে সালাম ,রফিক , জব্বারদের বুলেটের সামনে বুক উঁচু করে দাড়াতে । সংগঠিত হয় ভাষার জন্য জীবন দেয়ার পৃথিবির ইতিহাসের একমাত্র ঘটনা । এরই ফলশ্রুতিতে সরকার বাধ্য হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে ।

তারপর অনেক বার পূর্ব দিকে সূর্য উঠে পশ্চিমে ডুবে যায় । অনেক নদীর জল সাগরে গড়ায় । অনেক ফাল্গুন আসে আবার অনেক ফাল্গুন চলে যায়। পূর্ণ হয় অনেকের স্বাদ , শুধু যে দাবির জন্য শহীদদের এ আত্মত্যাগ তাই অপূরণীয় থেকে যায় ।

আবার অপেক্ষা করবো আরেকটি শহীদ দিবসের জন্য ,আবারও আমাদের একই আচরন । এভাবেই চলতে থাকবে যতদিন না বাংলা ভাষা অন্য আরেকটি ভাষায় বিলীন হয়ে যায় । না কখনো না ,বিবেকের সামান্য তাড়নাবোধ থেকে হলেও আমাদের হতাশার নিদ্রা থেকে জেগে উঠতে হবে , আল্যসের অসারতা ভেঙ্গে উঠে দাড়াতে হবে ,নিশ্চুপ মুখে ছাড়তে হবে প্রতিবাদেও তীব্র হুংকার । নিরিহ এই মানুষগুলোকে পরিনত হতে হবে এক একটি অগ্নি গোলায় , সে অগ্নিগোলার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে ভাষা অমর্যদাকরী ও ভাষা ব্যবসায়ীদের প্রাসাদ।
এতো অসম্ভব ,অমরা কীভাবে এগুলো সম্ভব করবো , যেখানে আমাদের মাঝে ভাসানী , শেরেবাংলারা নেই ।
হ্যাঁ ,আমাদের এই ভীরু কাপুরুষতাপূর্ণ চিন্তার জন্যই ওরা আমাদের উপর আরো শক্ত করে করে চেপে বসে । ভাসানী ,শেরেবাংলার অপেক্ষা আমাদের শেষ হয়না আর ওদেরও সাহস বেড়ে গিয়ে খঞ্জর এগিয়ে আনে আমাদের শাহরগের কাছ থেকে আরো কাছে ।

একসময় খনজরে হৃদপিন্ড বিদ্ধ হয়ে আমরা কাতরাতে থাকি মরণযন্ত্রনায়। কিন্তু তখনো আমরা অপেক্ষা করি একজন ভাসানী আসবে আমাদের বাঁচানোর জন্য।

অপেক্ষাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ি আমরা, কিন্তু আমরা জানি না যে জাতি নিজে ভাসানী, শেরেবাংলা হতে ভয় পায় অপেক্ষা করে অন্য কারো জন্য তাদের মাঝে কখনো কোন ভাসানী , শেরেবাংলার জন্ম হয় না ।

কারো জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই শুরু করুন । ভাষার এই মাসে নূন্যতম একজন নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান দানের চেষ্টা করুন । সামর্থের মধ্যে কিছু শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করুণ । ভিনদেশী চ্যানেল না দেখার অভ্যাস করুণ ,প্রমিত বাংলা বলার চেষ্টা করুণ । হয়তো আমাদের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাগুলো থেকেই জন্ম নিবে ইতিহাস খ্যাত আরেকটি বিরল ঘটনার ।

 

ফেইসবুক থেকে করা মন্তব্যসমূহঃ

একই রকম আরোও

মন্তব্য করুনঃ

avatar
  Subscribe  
Notify of

আরোও দেখুন

Close
Close